বিশেষ সংবাদ:

আবু হেনা মোস্তফা কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Logoআপডেট: শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

এবি প্রতিবেদক

'অনেক বৃষ্টি ঝরে/ তুমি এলে যেন এক মুঠো রোদ্দুর/ আমার দু'চোখ ভরে' এরকম অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল৷ বাল্যকালেই গানের চর্চা শুরু করেছিলেন তিনি৷ হতে চেয়েছিলেন গায়ক৷ কিন্তু আবু হেনা মোস্তফা কামাল একটা সময় বুঝেছিলেন গাওয়া নয়, লেখার প্রবণতায় বাঁধা তাঁর জীবনবীণা৷ লেখালেখির শুরুতে তাই কবিতা ও গান রচনার প্রতি ছিল তাঁর মত্ততা৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই রচনা করেছেন অনেক কালজয়ী গান ৷ গীতিকার হিসেবে ওই বয়সেই পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য ৷
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, কবি এবং লেখক আবু হেনা মোস্তফা কামালের মৃত্যুবার্ষিকী।  বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালে ১৯৮৯ সালের এই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে  তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷ মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর৷ ঢাকার আজিমপুর নতুন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি ৷
 
পাবনা জেলার পাবনা থানার গোবিন্দা গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্ম৷ বাবা এম. শাহজাহান আলী ছিলেন প্রথম জীবনে স্কুলশিক্ষক, পরে কোনো অফিসের হেডক্লার্ক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ অকালেই মারা যান তিনি৷ আবু হেনা মোস্তফা কামালের মা খালেসুননেসা দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন৷ তিনি গান ভালো গাইতেন ৷ ছেলেমেয়েদের মানুষ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি৷
আবু হেনা মোস্তফা কামালরা ছিলেন তিন ভাইবোন ৷ সবার বড় বোন সাবেরা খাতুন শামসুন আরা ৷ সাবেরা খাতুনের স্বামী খ্যাতিমান সাংবাদিক কেজি মুস্তফা ৷ সেই সূত্রে সাবেরা খাতুন সাবেরা মুস্তফা নামেই পরিচিত৷ তার পরে আবু হেনা মোস্তফা কামাল৷ ভাইবোনদের মধ্যে ছোট আবুল হায়াৎ মোহাম্মদ কামাল৷
 
পাবনা জেলা স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাস করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল৷ ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে ১৩তম স্থান অধিকার করেন৷ ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ৭ম স্থান লাভ করেন৷ ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি৷ একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন৷ উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল৷ পরে ১৯৬৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং (১৮১৮-১৮৩১)' শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ৷
১৯৫৬ সালের ২৫ অক্টোবর হালিমা খাতুনকে নিয়ে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন৷ আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও হালিমা মোস্তফা দম্পতির পাঁচ সন্তান৷ সন্তানদের মধ্যে কাবেরী মোস্তফা, কাকলী মোস্তফা, নজরুল সঙ্গীতের খ্যাতিমান শিল্পী সুজিত মোস্তফা, শ্যামলী মোস্তফা, এবং সৌমী মোস্তফা৷
ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো গান তিনি লেখেননি ৷ তার সকল গান হয়ে আছে অমলীন। বেঁচে থাকতে গানের কোনো সংকলন করেননি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ৷ মৃত্যুর পর ১৯৯৫ সালে তাঁর দুই শতাধিক গান নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রকাশ করে 'আমি সাগরের নীল' গ্রন্থ ৷ তাঁর গানের সংখ্যা আরও অনেক বেশি ৷ দুই হাজারের মতো গান লিখেছেন তিনি ৷ আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনেক গানের বিষয় হয়েছে প্রেম ৷ প্রেমের বহুবিচিত্র অনুভূতিকে গীতিময়তার পাশাপাশি কাব্যের সংমিশ্রণে গানে গানে ফুটিয়ে তুলেছেন ৷
আবু হেনা মোস্তফা কামালের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে৷ তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজে কিছু দিন শিক্ষকতা করেন৷ ১৯৬০ সালে যোগ দেন রাজশাহী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে৷ দুই বছর সেখানে ছিলেন৷ ১৯৬২ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক হয়ে ঢাকায় চলে আসেন৷ ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন৷ একই পদে স্থায়ী নিয়োগ পেয়ে ১৯৬৫ সালে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে৷
১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার পর তিনি রিডার পদে উন্নতি লাভ করেন ৷ আবু হেনা মোস্তফা কামাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯৭৩ সালের ৫ অক্টোবর৷ সেখানে ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হন আবু হেনা৷ ১৯৭৮ সালে ফিরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি৷ ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি ৷
 
বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানে যেসব গানকে আমরা চিরসবুজ বলতে পারি সেসব গানের মধ্যে আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনেক গান অনন্য উজ্জ্বল৷ ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া আবু হেনা মোস্তফা কামালের গান দিয়ে ৷ গানের কথা ছিল, 'ওই যে আকাশ নীল হ'লো, সে শুধু তোমার প্রেমে' ৷ চলচ্চিত্রের জন্যও অনেক গান লিখেছেন আবু হেনা ৷ বাংলাদেশের যেসব চলচ্চিত্রে তাঁর গান ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'দর্পচূর্ণ', 'যোগবিয়োগ', 'অনির্বাণ', 'সমর্পণ', 'অসাধারণ' ও 'কলমীলতা' ৷ এর মধ্যে 'অসাধারণ' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও তাঁর রচনা ৷ চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন মুস্তফা আনোয়ার ৷
 
আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিজের লেখা নিয়ে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে৷ শুরুতে তিনি লিখতেন কবিতা ও গান৷ গানের কথা আগেই বলা হয়েছে ৷ পঞ্চাশের দশকে শুরু করলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় প্রায় দুই দশক পর৷ ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আপন যৌবন বৈরী'৷
আবু হেনা মোস্তফা কামালের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'যেহেতু জন্মান্ধ' প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের দশ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে ৷ এর চার বছর পর (মৃত্যুর এক বছর আগে) ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ 'আক্রান্ত গজল' ৷ তিনটি গ্রন্থে মোট শতাধিক কবিতা রয়েছে৷ এর বাইরে তাঁর আরও অনেক কবিতা অপ্রকাশিত থেকে গেছে৷ গান দিয়ে যেমন শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছিলেন তেমনি কবিতা দিয়েও পাঠকের চিত্ত জয় করেছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল৷ কবিতার পাশাপাশি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন একজন উত্কৃষ্ট মানের প্রাবন্ধিক৷ কবিতা দিয়ে সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও প্রবন্ধ ও সমালোচনায় ছিলেন সবচেয়ে সফল ৷
 
বাংলা কবিতা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল একুশে পদক(১৯৮৭)সহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার- সম্মাননা।