বিশেষ সংবাদ:

লোকগীতির ধারায় ঘাটু গান

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

এবি প্রতিবেদক
ঘাটু গান ময়মনসিংহ ও সিলেট জেলার ভাটি অঞ্চলে প্রচলিত একপ্রকার লোকগীতি। সঙ্গীতের ধারায় যা আজ বিলুপ্ত প্রায়।

 

অঞ্চলভেদে ঘাটু শব্দের উচ্চারণগত ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ কেউ শব্দটিকে “ঘাঁটু’’, “ঘেটু’’, “গেন্টু’’, “ঘাড়ু’’, “গাড়ু’’, নামে পরিচিত।

 

তবে শিক্ষিত লোকজন একে ঘাটু হিসেবেই ব্যবহার করেন। সুনামগঞ্জের লোকজন ঘাটুকে “ঘাডু’’ বলে থাকে। ষোলশ শতকের শেষের দিকে ঘাটুগানের প্রচলন হয় বলে গবেষকরা ধারনা করছেন। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, শ্রীকৃষ্ণের প্রেমমগ্ন কোনো এক ভক্ত রাধা সেজে কৃষ্ণের অপেক্ষায় ছিলো। তখন তার কিছু ভক্ত গড়ে ওঠে। এই ভক্তদের মধ্য হতে ছেলে শিশুদের রাধার সখি সাজিয়ে নেচে নেচে বিরহের গান গাওয়া হতো এবং এভাবেই ঘাটু গানের প্রচলন শুর” হয়। অনেকের ধারনা ঘাট শব্দটি থেকেই ঘাটু গানের উৎপত্তি। কারণ এই গান পরিবেশন কর হত ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে। একে অনেকে ঘাটের গানও বলে। সাধারণত বর্ষাকালে বড় বড় নৌকায় এই গানের অসর বসতো। নদীর ঘাটে ঘাটে ঘুরে ঘুরে এই গান গাওয়া হতো। ঘাটু গানের প্রধান ব্যক্তি হলো একজন সুন্দর কিশোর, তাকেই বলা হয় ঘাটু। কিশোরটি সেজেগুজে গান গায় এবং নাচে। অধিকাংশ সময় সে মেয়েদের মত সাজগোজ করে ঘাটু অভিনয় করে। ঘাটের সঙ্গে থাকে দোহার সম্প্রদায়। ঘাটুর সঙ্গে সকলে মিলে দোহারে অংশ নেয়। ঘাটুগান মূলত প্রণয়গীতি। ঘাটু গান বলতে কোনো বিশেষ শ্রেণির গানকে বোঝায় না।

 

ঘাটুরা যে গান গায় তাকেই ঘাটু গান বলে। ঘাটুর নাচও এই গানের একটি আবশ্যিক বিষয়। এই গানের বিশেষত্ব হলো বালকদের পরিবেশনা নারীর বেশে সুদর্শন কিশোর বালক নাচ করে ঘাটু গান পরিবেশন করা। বংশ পরম্পরায় এই ঘাটু গান গেয়ে থাকে। এই গান বর্ষাকালে পরিবেশন করা হয়। এই গানের অসর নৌকায় বসে।
 
ঘাটু দলের প্রধান বা মূল গায়েনকে বলে “সরকার’’। এ গানে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঢোল তবলা, বেহালা, সারিন্দা, মন্দিরা, বাঁশি করতাল, হারমোনিয়াম প্রভৃতি। ঘাটু গানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক গ্রামের জোতদার এবং এর প্রধান কর্মী সমকামী যুবকরা। এই গান প্রধানত ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, কুমিল্লা জেলার উত্তরাঞ্চল, সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চলে এক সময় ব্যাপকভাবে প্রচলন ছিল।
বর্তমানে শিক্ষা বিস্তারের ফলে এই গানের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। যেসব এলাকা তুলনামূলকভাবে শিক্ষায়-দীক্ষায় পিছেয়ে এবং ভৌগলিকভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম, সেসব জনপদে এই ঘাটু গানের প্রচলন ছিলো। জনসাধারণের মধ্যে গ্রামের কৃষক ও দিন মজুর শ্রেণিই ছিলো ঘাটু গানের সাথে ওতোপোতভাবে জড়িত।

 


অবশ্য শিক্ষিত ধনীশ্রেণির পরিবারের অনেক বিশিষ্ট লোকও এই ঘাটু গানের মোহে পড়তে এবং পৃষ্ঠপোষকতা দান করত। কঠোর রক্ষণশীলতা, গতিহীনতা, শিক্ষার অভাব ও অপর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা ছিলো ঘাটুর প্রতিপালক সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। জনপ্রিয় উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ “ঘেটুপুত্র কমলা’’ নামে ঘাটু ছেলেদের জীবন কাহিনি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
 তথ্যসূত্র: লোকসাহিত্য-ঘাটুগান, সঙ্গীতকোষ ও উইকিপিডিয়া।