বিশেষ সংবাদ:

আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রয়াণদিবস আজ

Logoআপডেট: শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

এবি প্রতিবেদক
মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ একজন কীর্তিমান সাহিত্যপ-িত। মুন্সি তার বংশগত উপাধি এবং সাহিত্যবিশারদ হচ্ছে সুধী সমাজের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া উপাধি।

 

মুসলমানদের বাঙালিত্ববোধ জেগে ওঠার পেছনে তার রচিত ও প্রকাশিত প্রবন্ধের প্রভাব অপরিসীম। আজ ৩০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রয়াণদিবস। ১৯৫৩ সালের এই দিনে প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ ও সাহিত্যের এই বিরল ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন।  ১৮৩৮ সালে পটিয়া উপজেলার সুচক্রদন্ডী গ্রামের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে তিনি জন্ম লাভ করেন। তার বাবার নাম মুন্সী নুরউদ্দীন (১৮৩৮-৭১) এবং মায়ের নাম মিস্রীজান। তার মা ছিলেন হুলাইন গ্রামের প্রাচীন প্রখ্যাত পাঠান তরফদার দৌলত হামজা বংশের মেয়ে।

 


 
বাবা মারা যাওয়ার তিন মাস পর ঐতিহ্য অন্বেষণকারী আবদুল করিমের জন্ম হয়। ১৮৮৮ সালে ১৭ বছর বয়সে মাকেও হারান তিনি। ১৮৮২ সালে আবদুল করিমের দাদা-দাদি তাদের ছেলে আইনউদ্দীনের (আবদুল করিমের চাচা) বড় মেয়ে নয় বছর বয়স্ক বদিউননিসার সঙ্গে এগারো বছরের করিমের বিয়ে দেন।  কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদই প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৮৯৩ সালে প্রথম এন্ট্রাস পাস করেন। তিনি ১৮৯৫ সন পর্যন্ত এ অঞ্চলের একমাত্র এফ.এ পড়ুয়া ছাত্র ছিলেন। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি এফ.এ পরীক্ষার পাঠ শেষ করতে পারেননি।  ১৮৯৩ সনে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জেলার অর্ধাংশে প্রথম মুসলিম ইংরেজি শিক্ষিতের অসামান্য গৌরব অর্জন করেন। সম্ভবত স্কুলে মৌলভী শিক্ষকের অভাবেই আবদুল করিমকে সংস্কৃত পড়তে হয়।

 


 
পুঁথিসাহিত্যকে আপন সন্তানের মতো ভালোবাসতেন তিনি। চাকরি জীবনে অঢেল খাটুনির পর তিনি পুঁথি সংগ্রহ ও সাহিত্য সাধনায় জীবনের বড় অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন। আবদুল করিম পেশা হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রামে মিউনিসিপ্যাল স্কুলে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে অবসর নেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ।
তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। মধ্যযুগীয় মুসলিম সাহিত্যিকদের কর্ম তার আগ্রহের বিষয় ছিল। তার সংগৃহীত পুঁথির অধিকাংশই ছিল মুসলিম কবিদের রচিত। এসব পুঁথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু কবিদের পুঁথিগুলো রাজশাহীতে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের রক্ষিত রয়েছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯২০-২১ সালে দুই খ-ে তার লেখা বাংলা পুঁথির তালিকা ‘বাঙালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুঁথির তালিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ‘পুঁথি পরিচিতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
 
তিনি ১১টি প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর ইসলামাবাদ নামে তাঁর লেখা বই রয়েছে। পূর্বে অজ্ঞাত ছিলেন এমন প্রায় ১০০ জন মুসলিম কবিকে তিনি পরিচিত করেন। তার উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত পুঁথিসমূহের মধ্যে জ্ঞানসাগর, গোরক্ষ বিজয়, মৃগলব্ধ, সারদা মুকুল ইত্যাদি অন্যতম।
নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে ‘সাহিত্যসাগর’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে এবং চট্টল ধর্মম-লী তাকে ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি বরাবরই শেষোক্ত খেতাবটি পছন্দ করতেন এবং নিজ নামের সঙ্গে তা ব্যবহার করতেন।

 


 
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক পদও অলংকৃত করেন। সৈয়দ এমদাদ আলি প্রকাশিত ও সম্পাদিত ‘নবনূর’ (১৯০৩ সনে প্রকাশিত), এয়াকুব আলি চৌধুরী প্রকাশিত ও সম্পাদিত ‘কোহিনূর’ (১৩০৯), মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন প্রকাশিত ও সম্পাদিত ‘সওগাত’ (১৯১৮), আবদুর রশিদ সিদ্দিকী প্রকাশিত ও সম্পাদিত ‘সাধনা’ (১৩২৭) এবং ‘পূজারী’ নামের একটি পত্রিকারও প্রধান সম্পাদক হিসেবে তার নামাঙ্কিত হয়েই প্রকাশিত ও পরিচিত হয়।
বস্তুত আবদুল করিমই কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব পূর্বকালে ছিলেন একমাত্র মুসলিম লেখক, যিনি হিন্দু মুসলিম সমাজে সমভাবে ছিলেন পরিচিত এবং স্বীকৃত।