বিশেষ সংবাদ:

আসাদুজ্জামান নূর দেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতির অনন্য পথিকৃৎ

Logoআপডেট: বুধবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব

৯০-এর দশকে হুমায়ুন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে ‘বাকের ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। বহুমুখী প্রতিভায় বিদগ্ধ এই গুণী দেশের আবৃত্তি জগতেরও পথিকৃৎ বাচিকশিল্পী ও সংগঠক।

এছাড়াও তিনি থিয়েটার, টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্রে সু-অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন অসংখ্য-অগণিত মানুষের মনে। বলছি, দেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রিয়মুখ ও বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের কথা। অভিনয়ের পাশাপাশি আগে থেকেই তিনি রাজনীতি করতেন। ২০১১ সালে করেছেন রিয়েলিটি শো ‘কে হতে চায় কোটিপতি’।

আজ ৩১ অক্টোবর গুণী এই সংস্কৃতিজনের জন্মদিন। বরেণ্য এই মিডিয়া ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ১৯৪৬ সালের এই দিনে নীলফামারী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। এবার ৭২ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন তিনি। নন্দিত এই অভিনেতার এবারের জন্মদিনটিও কাটবে পরিবার ও বন্ধুদের সাথেই ঘরোয়া আয়োজনে। তার বাবার আবু নাজিম মো. আলী এবং মাতা আমীনা বেগম।

উত্তরবঙ্গের নীলফামারী জেলা শহরে শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্যের প্রথম ভাগ কেটেছে সরকারের বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী ও সময়ের চিরসবুজ অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের। বাবা-মা দু’জনই ছিলেন স্কুল শিক্ষক। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে আসাদুজ্জামান নূর সবার বড়। ১৯৮২ সালে তিনি ডাক্তার শাহীন আকতারকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে সুদীপ্ত লন্ডনে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে দেশে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত। আর মেয়ে সুপ্রভার বিয়ে হয়েছে গেল বছর।

জীবনের প্রথম দিকে বাম রাজনীতিকে গায়ে মেখে দুর্বার যাত্রা শুরু করা নূর শ্রেণি-সংগ্রাম, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সংগ্রাম করেছেন জীবনের অনেকটা সময়। বহমান স্রোতের আদর্শবান মানুষ হিসেবে আসাদুজ্জামান নূর পেয়েছেন যশ, খ্যাতি, প্রশংসা, পুরস্কার এবং লক্ষ-কোটি দর্শকদের ভালোবাসা।

১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন আসাদুজ্জামন নূর। পরবর্তীতে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আসাদুজ্জামান নূর মুক্তিযুদ্ধে ৬ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

জীবনের দ্বিতীয় ভাগে হয়ে ওঠেন অভিনয়ের যোদ্ধা। তিনি কখনও ‘এই সব দিনরাত্রি’র শফিক, কখনও ‘অয়োময়’র ছোট মীর্জা, কখনও বা ‘সবুজ ছায়ার’ ডাক্তার চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রশংসা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু কিংবদন্তি হয়ে আছেন ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাই চরিত্রে অনন্য অভিনয়ের জন্য। অবশ্য ‘নক্ষত্রের রাত’ নাটকে তার হাসান চরিত্রটিও একজন উঁচু পর্যায়ের দার্শনিকের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এসব নাটক ছিল প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের রচিত।

একই লেখকের রচনা ও পরিচালনায় ‘আগুনের পরশমনি’ চলচ্চিত্রে কাজ করেও নিজেকে সুউচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। এরপর থেকে কেবল অভিনয় ভুবনে নিজেকে সমৃদ্ধ করেই চলেছেন। অভিনয় তার কতটা প্রিয় সেটি টের পাওয়া যায় যখন একজন মন্ত্রী হয়েও তাকে এখনো অভিনয় করতে দেখা যায়। ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১‎৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নীলফামারী জেলা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন।

থিয়েটারপ্রাণ আসাদুজ্জামান নূর মঞ্চ থেকেই অভিনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। দেশের প্রথমসারির থিয়েটার সংগঠন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে বহুদিন ধরে কাজ করে আসছেন তিনি। স্বনামধন্য এই দলের জন্য বিদেশি একটি নাটকের অনুবাদ করেছিলেন নূর। জনপ্রিয় সেই প্রযোজনাটির নাম ‘দেওয়ান গাজির কিসসা’। প্রায় দুই দশক পর সম্প্রতি মঞ্চে এসেছে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সাড়াজাগানো নাটক ‘গ্যালিলিও’। এই নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর আবারও সু-অভিনয় নিয়ে মঞ্চনাটকে ফিরেন প্রিয়মুখ আসাদুজ্জামান নূর।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এশিয়াটিক সোসাইটি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নাগরিকসহ বেশ কিছু জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন তিনি। পাশাপাশি অভিনেতা, আবৃত্তিকার, বিজ্ঞাপন নির্মাতা, ব্যবসায়ী, সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্বস্তরে স্বীকৃত তিনি।

জীবনের ৭১টি বসন্ত পেরিয়ে আসা গুণী এই সংস্কৃতিজনের জন্মদিনে তার প্রতি শুভেচ্ছা, বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।