বিশেষ সংবাদ:

গল্পে জাদু ছড়িয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮

এবি প্রতিবেদক

সাহিত্য ছাড়াও তিনি নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র, নাটক, গান প্রভৃতি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, গল্পের জাদুকর ছিলেন নন্দিত এই কথা সাহিত্যিক। গল্প দিয়েই তিনি মানুষের মনকে নানাভাবে আলোড়িত করেছেন।

মিসির আলী ও হিমুর লজিক-এন্টি লজিক, মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখ; তার গল্প থেকে বাদ পড়েনি মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ইতিহাসের বাদশা নামদাররা। আর এতেই তিনি পেয়েছেন জনমানুষের উপচে পড়া ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবনত ফুলঝুরি।  বলছি, বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাশিল্পী এবং হিমু ও মিসির আলীর স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন শুধু গল্পের ঝুঁড়ি খুলে বসেছিলেন, গল্পে গল্পে জীবনের কথা বলেছিলেন, আর আনন্দ-বিষাদে ভাসিয়েছিলেন অগণিত পাঠককে। তিনি বেখায়ালি আবার দারুণ খেয়ালি বাঙালি মধ্যবিত্তের মুগ্ধতাকে, আনন্দ অশ্রুকে নতুন রূপ দিয়েছেন। অনাবিষ্কৃত বা অকথিত জীবনের সাথে পরিচয় করিয়েছেন।

তাকে বলা হয়ে থাকে আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি ছিলেন সংলাপ-প্রধান নতুন শৈলীর জনক। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে এমনকি বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত।

সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তার সাহিত্য-সৃজনের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তার সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবসমাজকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে।

তার রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘গল্প-সমৃদ্ধি’। এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করেন যাকে একরূপ যাদু-বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায়। হুমায়ূন আহমেদ রচিত গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান।

তার বর্ণনা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা রয়েছে প্রতিভাধর এই সাহিত্যিকের। যদিও সমাজ-সচেতনতার অভাব নেই তবুও তার রচনায় রাজনৈতিক প্রণোদনা অনুপস্থিত বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সকল রচনাতেই একটি প্রগাঢ় শুভবোধ ক্রিয়াশীল থাকে; ফলে ‘নেতিবাচক’ চরিত্রও তার লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ।

বিষয়ের বৈচিত্র্য, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ সব মিলিয়ে এ এক অভিনব ধারা। এই সম্মোহনী শক্তি নিয়ে, হুমায়ূন আলো ফেলেছেন মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার ওপর। এই আলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠকের কাছে হয়েছে আরো স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন। বৃষ্টিধারা যেমনি ভূমিতলের অন্তরে প্রবেশ করে বহু প্রাণের সঞ্চার করে, হুমায়ূন সাহিত্য তেমনি, পাঠককে সঞ্চারিত করে অন্য সাহিত্যের দিকেও। হুমায়ূন আহমেদকে বলা যায় সাহিত্যপাঠের প্রবেশমুখ।

তার লেখা হচ্ছে সাহিত্যের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আকর্ষণের চুম্বক। বই-বিমুখ পাঠকদের ভেতর তিনি সাহিত্য-পাঠের স্পৃহা তৈরি করেছেন। পড়ার তৃষ্ণা ও চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাইতো আজো পাঠক মহলে তিনি সমান জনপ্রিয়। তার সাহিত্য-সৃজনের প্রতি মানুষের তৃষ্ণা যেন চিরকালের। এই তৃষ্ণা নিয়েই  হুমায়ূন আহমেদ ও তার সাহিত্যকে হাতরে বেড়াবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। এমনিভাবেই বাঙালির মাঝে অনন্তকাল চর্চিত হবে হুমায়ূন-সৃজন।