বিশেষ সংবাদ:

আজ কথাসাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব
হুমায়ূন আহমেদ বাঙালির জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর মতো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক যুগে-যুগে, কালে-কালে খুব বেশি জন্মায় না।

উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, গান প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদগ্ধ এই লেখকের সাফল্য আকাশচুম্বী। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও ছিল তাঁর সমদক্ষতা।বলছি, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ-এর কথা।

আজ ১৩ নভেম্বর কীর্তিমান এ কথাসাহিত্যিকের ৭০তম জন্মদিন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে হুমায়ূন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পিরোজপুরে এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি শহিদ হন। পিতা ফয়জুর রহমানের সাথে মিল রেখে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান, আর ডাকনাম কাজল। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।

হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, তাঁর পিতা ছেলে-মেয়েদের নাম পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন। ১৯৬২-৬৪ সালে চট্টগ্রামে থাকাকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল বাচ্চু। তাঁর ভাই ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম আগে ছিল বাবুল এবং ছোটবোন সুফিয়ার নাম ছিল শেফালি। মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের স্বনামধন্য শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক; সর্বকনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব একজন রম্যসাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট।
তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। হুমায়ূন আহমেদ পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।

ছাত্র জীবনেই ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবন শুরু হয়। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমেদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত বাংলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমেদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। এরপর গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক-নন্দিত নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন হুমায়ূন আহমেদ।
১৯৭৩ সালে হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিন-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। মেয়ে বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ ও শিলা আহমেদ। ছেলে নুহাশ আহমেদ। আরেক ছেলে অকালে মারা যায়। ২০০৫ সালে হুমায়ূন আহমেদের সাথে গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে এবং ওই বছরই তিনি নাটক-চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম কন্যা সন্তানটি মারা যায়। দুই ছেলে নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।

হুমায়ূন আহমেদ-এর নির্বাচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মন্দ্রসপ্তক’, ‘দূরে কোথাও’, ‘সৌরভ’, ‘নি’, ‘ফেরা’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘সাজঘর’, ‘বাসর’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘নিশীথিনী’, ‘আমার আছে জল’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘আকাশ ভরা মেঘ’ অন্যতম।
তাঁর উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক নাটক- ‘এইসব দিন রাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’, ‘তারা তিনজন’, ‘আমরা তিনজন’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’।

১৯৯০-এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। নাটক সিনেমায় তাঁর রচিত অনেক গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তিনি ছবি আঁকতেও ভালোবাসতেন।

সাহিত্য সংস্কৃতির বিভিন্নক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং শিশু একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনি, চলচ্চিত্র ও সংলাপ বিভাগে), ১৯৭৩ সালে লেখক শিবির পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে মাইকেল মধুসূদন পদক, ১৯৮৮ সালে বাচশাস পুরস্কার এবং ১৯৯০ সালে হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার ও জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কার সম্মাননায় ভূষিত হন।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই মলাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হসপিটালে বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ মৃত্যুবরণ করেন। হুমায়ূন আহমেদকে তাঁর যত্নে গড়া গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।
তিনি এমন একজন অমর কথাসাহিত্যিক, যিনি যুগ থেকে যুগান্তর বেঁচে থাকবেন তাঁর রচিত গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র, গান ইত্যাদি অনবদ্য সৃজনকর্মে। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় তিনি অক্ষয় থাকবেন কোটি-কোটি ভক্ত, পাঠক, দর্শক আর শুভানুধ্যায়ীর অন্তরে।