বিশেষ সংবাদ:

রফিক আজাদ বাংলা কবিতায় অন্তর্গত উপলব্ধির কবি

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৯

ফারুক হোসেন শিহাব
রফিক আজাদ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী কবি। বাংলা কবিতায় ইউরোপীয় আধুনিকতা চিন্তার যে ছায়া আমাদের ভাষাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছিল, রফিক আজাদ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। একাধারে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, কবি, সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখক। একটা সময় কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি।

আজ ১২ মার্চ কীর্তিমান এই কবি ও সাহিত্যিকের তৃতীয় প্রয়াণদিবস। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৮ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ২০১৬ সালের এইদিনে অগণিত ভক্ত-অনুরাগীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে প্রগতির এই শক্তিমান কবি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

রফিক আজাদ ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।তারা ছিলেন তিন ভাই-দুই বোন। কিন্তু তার জন্মের আগে সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই মাওলা ও তৎপরবর্তী বোন খুকি মারা যান। রফিক আজাদ যখন মায়ের গর্ভে তখন অকাল প্রয়াত বড়বোন অনাগত ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘জীবন’। রফিক আজাদ ‘জীবনের’ই আরেক নাম।

১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রফিক ভাষা শহিদদের স্মরণে বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে মিছিল করেন। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে, আদর্শ মানুষ হিসেবে। ১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় একবার বাবার হাতে মার খেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে জাদু শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়িতে পাঠান। কৈশোরে লাঠি খেলা শিখতেন নিকটাত্মীয় দেলু নামক একজনের কাছে। তিনি সম্পর্কে রফিক আজাদের দাদা। দেলু দাদা ছিলেন পাক্কা লাঠিয়াল। দেলু দাদা খুব আদর করতেন রফিক আজাদকে।

গুণী গ্রামের পাশেই মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নশ্রেণির হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করে ভর্তি হলেন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণিতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার মাইল দূরত্বে স্কুল। কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গেরস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। হামিদপুরে আগের মতো আর সেই বিধিনিষেধ নেই। কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তার। এই মাঈনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু।

হামিদপুরে মাঈন উদ্দিনের সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে। সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন কিশোর রফিক আজাদ।

অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণিতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে আসে। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল করে বসল। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা। অবশেষে ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।

উত্তাল ষাটের দশকেই রফিক আজাদের চিন্তা আর কবিতার বিকাশ ঘটে। বাংলা কবিতায় নতুনত্ব ও স্বকীয় ধারার প্রবর্তন করেছেন তিনি। উদ্দাম, সহজ আর বোহেমিয়ান জীবনাচরণের জন্যও তিনি আলোচিত। তবে আধুনিক কবিতার যে বৈশিষ্ট্য- নাগরিক বিচ্ছিন্নতা, সমকালীন বাস্তবতা, সময়ের চাপ, রাজনৈতিক মনস্কতা, ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা সবই তার কবিতায় দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের কবিতার ধারায় রফিক আজাদের কবিতা যোগ করেছে স্বতন্ত্র এক মাত্রা। নিরন্তর সাধনায় কবি রফিক আজাদ নিজস্ব শিল্প-ভুবন তৈরি করেছেন বিষয়-বৈচিত্র্যে ও প্রকার-প্রকরণে তিনি সাজিয়ে তুলেছেন কবিতার ভুবন। তার কবিতার মূল সুর ব্যক্তির অন্তর্গত উপলব্ধি। ব্যক্তির সীমানা ছাড়িয়ে তার কবিতায় নীরবে ভেসে ওঠে স্বদেশের চিত্র। তার কণ্ঠে শোনা যায়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যাপিত জীবনের সুর আর স্বর। পাশাপাশি রফিক আজাদের প্রেমের কবিতার মধ্যে নারীপ্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।

তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই কবি। দেশ স্বাধীনের পর বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেন। রফিক আজাদ ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় দশক বাংলা একাডেমির মাসিক সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার-এর সম্পাদক ছিলেন। একাডেমির চাকরি ছেড়ে ইত্তেফাক গ্রুপের ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলার লেকচারার ছিলেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে। তার লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ‘অসম্ভবের পায়ে’, ‘সীমাবদ্ধ জলে` সীমিত সবুজে’, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, ‘পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি’, ‘প্রেমের কবিতাসমগ্র’, ‘বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে’, ‘বিরিশিরি পর্ব’, ‘রফিক আজাদ শ্রেষ্ঠকবিতা’, ‘রফিক আজাদ কবিতাসমগ্র’, ‘হৃদয়ের কী বা দোষ’, ‘কোনো খেদ নেই’ এবং ‘প্রিয় শাড়িগুলো’।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য কবি রফিক আজাদ একুশে পুরস্কার (২০১৩), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৭), কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৭৯), আলাওল পুরস্কার (১৯৮১), ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮২), সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯), হাসান হাফিজুর রহমান স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৬), কবি আহসান হাবীব পুরস্কার (১৯৯১) এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননায় (১৯৯৭) ভূষিত হন।

২০১৬ সালের ১২ মার্চ রফিক আজাদ মৃত্যুবরণ করেন। আজ তিনি স্বশরীরে না থাকলেও যতদিন বাংলাভাষা ও সাহিত্য থাকবে, ততদিন রফিক আজাদ ও তার অনন্য সকল সৃষ্টি অপার উজ্জ্বল্যে বেঁচে থাকবে সকল বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে।