বিশেষ সংবাদ:

একজন বহুমাত্রিক শিল্পী এসএম জাহাঙ্গীর

Logoআপডেট: শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২০

ফারুক হোসেন শিহাব

শব্দের শরীরে তিনি কবিতার বীজ বুনেন, রঙ-তুলির আলতো পরশে ক্যানভাসে আঁকেন জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই কাব্য, সেই ছবি জীবনবাস্তবতায় মিলেমিশে একাকার। বলছি, কবি এসএম জাহাঙ্গীরের কথা। আপাদমস্তক এই শিল্পমানব একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, বাচিকশিল্পী, উপস্থাপক, সংগঠক এবং জাতীয় কবিতা পরিষদ-এর মুখপত্র ‘খুঁটি’র সম্পাদক। ১৯৬৪ সালের ২০ মার্চ লক্ষ্মীপুর পৌরসভার পশ্চিম আটিয়াতলী গ্রামে জেলার অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার ও সুগৃহিনী চাঁদবানুর কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহন করেন এসএম জাহাঙ্গীর। তিনি এসএম জাহাঙ্গীর হিসেবে পরিচিত হলেও তার পুরো নাম শাহরিয়ার মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। ছয় ভাই তিন বোনের মধ্যে এসএম জাহাঙ্গীর সর্বকনিষ্ঠ। ছেলেবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেন জাহাঙ্গীর। মূলত, পরিবার থেকেই তার ভেতর শিল্পের বীজ অঙ্কুরিত হয়। পরবর্তী দীর্ঘ শিল্পজীবনে তিনি বাবা, মা, বড় ভাই চিত্রকর আবদুল মালেক, মেহের উল্যাহ ও সংস্কৃতিজন আবুল হাসেম (ফুফাতো ভাই)’র প্রেরণা পেয়েছেন।
১৯৭৮ সালে লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (তৎকালীন এইচ এ সামাদ একাডেমি) থেকে এসএসসি শেষে রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ গ্রাফিক্স আর্টস ইন্সটিটিউট থেকে তিন বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন। দু’বছরের মাথায় তিনি দেশসেরা বিজ্ঞাপনী সংস্থা ওয়ান্ডার সাইন (প্রা:) লি: -এ ডিজাইনার পদে যোগদান করেন। সেখানে কর্মকালীন সময়ে নাট্যব্যক্তিত্ব আলী জাকের, এটিএম শামসুজ্জামান, প্রয়াত ফরিদ আলীসহ দেশবরেণ্য নাট্যজনদের সাথে সখ্যতার কারণে ঢাকা মহিলা সমিতিতে প্রদর্শিত বিভিন্ন নাটকের পোস্টার ডিজাইনের কাজ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের শিল্পী-কুশলী, পরিচালক, প্রযোজক, কবি, সাহিত্যিকদের সাথে তার সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশক মহিউদ্দিন ফারুক ও গুণী নির্মাতা প্রয়াত সুভাষ দত্তের মাধ্যমে ‘দহন’, ‘বিচারপতি’, ‘একটি পয়সা দাও’ সহ ছয়টি চলচ্চিত্রের পোস্টার ও পত্রিকার বিজ্ঞাপন ডিজাইনের কাজ করেন। ড. কামাল আবু নাসের চৌধুরী বিটিভি’র জেনারেল ম্যানেজার পদে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর অধীনে বেশ কিছু বিজ্ঞাপনও নির্মাণ করেন এসএম জাহাঙ্গীর। তার মধ্যে- গংগা-এযুগের প্রসাধনী, হোন্ডা ১২৫ সিসি মোটর সাইকেল, সেঞ্চুরী শার্টিং এন্ড শ্যুটিং, আহম্মদ ফুড প্রোডাক্ট, বাটা-চল স্কুলে যাই -অন্যতম।
১৯৮৬ সালের মাঝামাঝিতে বাবার অসুস্থতার কারণে চাকুরি স্তফা দিয়ে লক্ষ্মীপুরে চলে আসতে হয় গুণী এই শিল্পীকে। এসেই জড়িয়ে পড়েন জেলার শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের সাথে। যোগদেন গোলাম মার্শেদ প্রতিষ্ঠিত ‘ফ্রেন্ডস্ নাট্যগোষ্ঠী’তে। এই নাট্যসংগঠনের ব্যানারে লক্ষ্মীপুর টাউন হলে মঞ্চায়িত দুটি নাটকে অভিনয় করেন এসএম জাহাঙ্গীর। ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ, লক্ষ্মীপুরের উদ্যোগে বিটিভি’র তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীকে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে সম্বর্ধনা দেন।

শিল্পের বিভিন্ন শাখায় তার রয়েছে ঈশ্বণীয় সাফল্য। কাব্যসৃজনেও তিনি অনন্য। এযাবৎ লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। তার কবিতায় উঠে এসেছে- সমাজ, রাষ্ট্র, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি ও প্রেমের গভীরতর উপলব্ধি। প্রতিনিয়ত তিনি মাটি, মানুষ ও মানবতা নিয়ে শব্দ বুনেন; সৃষ্টির স্বর্গীয় পরশে তুলে ধরেন অনবদ্য দৃশ্যকাব্য। এসএম জাহাঙ্গীরের আলোচিত কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধ ও মানচিত্র, রণে বিস্ফোরণ, বিরহী বসন্ত, পরমেশ্বর, হিংস্রতা, তুমিহীন মধ্যরাত, জ্যোৎস্নাা শরীরে বসত, স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী শুধু, একটি শুভ্র পথ দাও, অনাবাদী জমী চাই। তার একক, যৌথ ও সম্পাদিত মিলে এযাবৎ পনেরটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- কবিতাপত্র, প্রেম ও নদী, ব্লাউজের হুক। তার সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে- ‘হৃদয়ে নন্দিনী’, ‘আঁধারে শতশিখা’ অন্যতম।
গ্রন্থ প্রকাশে পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময় বেশ কিছু পত্রিকা ও কোড়পত্র সম্পাদনা করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে- জাতীয় কবিতা পরিষদ মুখপত্র ‘খুঁটি’, কবিতার কাগজ ‘কাব্যগৃহ’ ও ‘নন্দিনী’। পাশাপাশি প্রচ্ছদ’র সহসম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে, একজন নিরেট কবিতার আন্দোলক ও সংগঠক তিনি। সংস্কৃতির একজন জাগ্রত ও নিবেদিত অভিযাত্রী হিসেবে যেমনিভাবে তাকে দেখা যায় কবিতা ও মঞ্চে তেমনি তিনি সরব রয়েছেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির সকল নৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে।

সাহিত্য পত্রিকা ‘খুঁটি’ সম্পাদনার সুবাদে স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, সমুদ্র গুপ্ত, মহাদেব সাহা, মুহাম্মদ নুর”ল হুদা, রবিউল হুসাইন, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ড. মুহাম্মদ সামাদ, আসলাম সানী, তারিক সুজাত, ড. নিপু শাহাদাত সহ দেশের প্রথমসারির কবি-সাহিত্যিকদের ভালোবাসা ও প্রেরণা পেয়েছেন এবং তাঁদের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ‘খুঁটি’তে প্রকাশ করা অব্যহত রেখেছেন।
কবি এসএম জাহাঙ্গীর জাতীয় কবিতা পরিষদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সভাপতি, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদের জেলা সভাপতি, বাংলাদেশ কমার্শিয়াল আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রথম আলো বন্ধুসভা-লক্ষ্মীপুরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, নজর”ল একাডেমি-লক্ষ্মীপুরের সহসাধারণ সম্পাদক, লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক (প্রাক্তন), জেলা শিল্পকলা একাডেমির চার”কলা বিভাগের প্রাক্তন প্রশিক্ষক এবং জেলা শিশু একাডেমির চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত কবিতা পাঠ ছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশনে বহুবার তার আবৃত্তি প্রচারিত হয়েছে। একইভাবে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আমন্ত্রিত হয়ে অসংখ্য কবিতা আবৃত্তি করেছেন। তার আঁকা ছবি ও লেখা মানপত্র দেশের অনেক মন্ত্রী, সাংসদ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বাংলোতে শোভা পাচ্ছে।
পারিবারিক জীবনে তিনি ১৯৮৮ সালের ২৭ আগস্ট লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার রসুলগঞ্জস্থ হামিদ উল্যাহ্ ভূঁইয়া বাড়ির মরহুম সামছুল ইসলাম সাহেবের মেঝোমেয়ে নাজমা ইয়াসমিন কাননের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের তিন পুত্র ও দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।

বহুমাত্রিক এই শিল্পজন জাতীয় কবিতা পরিষদ এওয়ার্ড ২০০৮, জাতীয় কবিতা পরিষদ সম্মাননা ২০১২, জীবনানন্দ সাহিত্য পুরস্কার ২০১১, ব্যাচ ৮৩ সম্মাননা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মনির আহমদ সম্মাননা এবং অর”ণিমা সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ ও লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ সম্মাননা ২০১৮ সহ বহু পুরস্কার সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সর্বদা কর্মচঞ্চল এই শিল্পী ২০১৪ সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক আবৃত্তি বিভাগে গুণী শিল্পী সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। শিল্পের মসৃণতায় বহুমাত্রিক শিল্পীর পথচলা হোক আরও সুদৃঢ় ও পল্লবিত। আজ ২০ মার্চ প্রচারবিমুখ এই কবি ও শিল্পীর শুভ জন্মদিন। এ জন্মতিথিতে তার দীর্ঘ সুখময় জীবন ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।