বিশেষ সংবাদ:

নাটকপাড়া মাতালেন আবৃত্তির প্রাণকোকিলা ডেইজি

Logoআপডেট: বুধবার, ০৮ জুন, ২০১৬

ফারুক হোসেন শিহাব
‘পৃথিবীতে যা কিছু চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ কবির এই অমর বাণী সকল পুরুষদের স্বরণ করিয়ে দেয় নারীর গুরুত্ব-কৃতিত্ব ও সক্ষমতার বহুমুখীতা।

 

একইভাবে নারী সমাজকে স্বীকৃতি ও সম্মান দেয়, অনুপ্রাণিত করে আগামীর পথচলায়। যুগে-যুগে, কালে-কালে অনেক নারীই শত প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে আলো ছড়িয়েছেন সমাজের আমানিষায়। নারী পিছিয়ে থাকবে কেন? নারী যে সকল প্রেরণার উৎস।

 

সেই উপলব্ধি থেকে ‘সংকটে-সাহসে ও শোকে-সংগ্রামে নারীর বিস্তার’ শ্লোগানে নাটকপাড়ায় ব্যতিক্রমী এক আয়োজন করে আবৃত্তিমেলা ও স্বরচিত্র। ৪ জুন শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে পরিবেশিত হয় সম্ভাবণাময়ী আবৃত্তিশিল্পী তামান্না ডেইজির একক আবৃত্তি অ্যালবাম ‘নারীবৃক্ষ ও স্বপ্নের মাদুলি’র প্রকাশনা এবং তার কন্ঠে জমকালো আবৃত্তি অনুষ্ঠান।


আসরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি কাজী রোজী, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, আবৃত্তিজন গোলাম সারোয়ার এবং মোঃ আহ্কাম উল্লাহ্। আবৃত্তিমেলা ও স্বরচিত্রের পরিচালক মাহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডাঃ শারমিন সুমী। সাম্মিরুন ইসলাম সাম্মির পরিচালনায় আলোচনা পর্ব শেষে পরিবেশিত হয় তারুণ্যদীপ্ত আবৃত্তিশিল্পী তামান্না ডেইজীর প্রাণছোঁয়া একক আবৃত্তি। এ পর্বে জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনপূর্ণ দর্শকদের মধ্যে ছিলনা পিন পতনের শব্দও। উন্মুখ হয়ে শুধুই তাকিয়ে থাকা। এরইমধ‌্যে সোনালী পাড়ের গাড় আকাশী শাড়ীতে দীপ্ত-পায়ে মঞ্চের মধ্যবিন্দুতে থাকা ডায়াসে এসে হাজির হলেন সেই চেনা মুখ- তামান্না ডেইজী।

 

ঝলমলে মায়াবী নয়নে উপছে পড়া দর্শকের উপস্থিতি চোখ বুলিয়ে তৃপ্তস্বরে নিবেদন করেন আবৃত্তির অনবদ্য পুষ্পাঞ্জলী। কবি গুরুর ‘বাণী’ কবিতার মধ্যদিয়ে যার সূচনা। উপভোগকারীদের জন্যে এ যেন এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। মিলনায়তনে উপস্থিত সবাই ততক্ষণে টের পেলেন- এই সন্ধ্যেটা মোটেও বৃথা যায়নি। এক এক করে সুবোধ সরকারের ‘শাড়ী’, ‘ময়ূরপঙ্খী’, ‘ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ে’ এবং ‘আমি ফিরোজা- একটি ভারতীয় মেয়ে’, চিত্রা লাহিড়ী’র ‘ইচ্ছে মেয়ে’, বুদ্ধদেব বসু’র ‘চিল্কায় সকাল’, ‘শামসুর রাহমানের ‘কালো মেয়ের জন্য পংক্তিমালা’, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘নূজাহান’, কাজী রোজীর ‘নারী বিস্তার’, কবিতা সিংহের ‘আমি সেই মেয়েটি’ এবং অরুণ মিত্রের ‘ও বেহুলা’ যেন কবিগণের ভাবনার গন্ডি ছাড়িয়ে ডেইজি গেঁথেছে মমত্বের নিখুঁতমালা। জনপ্রিয় এই আবৃত্তিশিল্পীর প্রাণছোঁয়া বাচিকশৈলীতে কবিতাগুলোর কয়েকজন কবি স্বশরীরে উপস্থিত থেকে পরম আনন্দে আফ্লুত হয়েছেন। ডেইজির উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন প্রাণ পেয়েছে কারুময়ী কন্ঠকোমলতায়।

 

হবেই-তো! যে তরুণী শিল্পের প্রতি দায় থেকে, সংগঠনের প্রতি অবারিত মমতা এঁকে মঞ্চে ও রাজপথে নির্বিক, সে-তো এক অপ্রতিরুদ্ধ শিল্পসারথী। আনুষ্ঠানিকতায় অতিথি এবং আয়োজকদের মুখেও তেমনি বর্ণবীণা বাজলো তাকে নিয়ে। পরিবেশনায় সেসব প্রশংসাকেও ছাড়িয়েছেন আবৃত্তিশিল্পের ক্লান্তিহীন এই তরুণী। তার মধুস্বরে যেন- শিল্পের-খই ফোটে, মনের আকাশে মূহুর্তেই চাঁদ ওঠে, অনুভূতিরা ঢেউ খেলে সৃজনের অথৈই সাগরে। একে নারীজাগরণ আর নারীসত্তার এক দুঃসাহসী উদাহরণ বলা যায়। কেননা, আবৃত্তিচর্চার ইতিহাসে এমনি ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ সত্যি বিরল। মাইক্রোফোন হাতে প্রাণবন্ত ডেইজি কখনো দাঁড়িয়ে কখনোবা পাতানো আসনে বসে চষে যান কবিতার শরীর। প্রাণের সে জাগরণে হৃদয় থেকে হৃদয় ছুঁয়ে উপভোগকারী সকলের অন্তরীক্ষে যেন স্থান করে নেন বহুমাতৃক এই কারুকন্ঠী।

 

একই আবহে কেতকী কুশারী ডাইসনের ‘চুড়ি’, তসলিমা নাসরিনের  ‘যদি হয় হোক’, হুমায়ুন আজাদের ‘আমাদের মা’, সব্যসাচী দেবের ‘কৃষ্ণা’, শুভদাস গুপ্তের ‘আমি সেই মেয়ে’, কাজী নজরুলের ‘ক্ষুদিরামের মা’, রহিমা আক্তার কল্পনার ‘চিঠি’, শঙ্খ ঘোষের ‘যমুনাবতী’, মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘শাহবানুর জন্ম’, আজীজুল হকের ‘নরকে এক মূহুর্ত’ এবং সর্বশেষ পরিবেশিত হয় আসাদ চৌধুরীর ‘রিপোর্ট ১৯৭১’।


স্বপ্রতীভ এই সুকন্ঠীর প্রবল দৃঢ়চিত্ত্ব, শব্দের কারুখেলা আর শতস্ফূর্ত উপস্থাপনে আয়োজনটি রূপ নেয় অনন্য দৃষ্টান্তে। তার কন্ঠের বৈচিত্রময় উঠা-নামা ও শিল্পরসের অনবদ্য মায়াখেলা আর ক্ষণে-ক্ষণে মুগ্ধ দর্শকদের সরব করতালি প্রাণে নাচনতোলে। কবিতাবেদে ডেইজি নিজেই কখনো হয়ে উঠেন এর চরিত্র, কখনোবা দর্শক-শ্রোতার ভাবচিত্ত্বে কবিতায় আওড়ানো প্রতিটি মূহুর্তের জীবন্ত ছবি আঁকেন সৃজনের আলিঙ্গনে। আসরের মাঝপথে একাধিকবার তার আবৃত্তিগুরু মাহিদুল ইসলামের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে একটুও ভোলেননি প্রতিশ্রুতিশীল এই আবৃত্তিশিল্পী।

 

শুধু তাই নয় আবহ ও যন্ত্রশিল্পীদের শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নিজের দল স্বরচিত্রের সহযাত্রীদেরও অভিনন্দিত করেন উদিয়মান এই কন্ঠবিজয়া। আসিফ আরমানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বজলুর রহমানের হৃদছোঁয়া আলোকায়নে নান্দনিক মঞ্চ পরিকল্পনা ছিল পলাশ হেনরিক সেন ও আব্দুর রহমান নূরের অনবদ্যসৃজন। শুধু মঞ্চে নয় সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাজপথেও তিনি দুরন্ত। শিক্ষিকা মা ও প্রকৌশলী পিতার এই সুযোগ্য মেয়েটি অনেক অসাধ্যকে মাড়িয়ে এগিয়ে চলছেন আপন আলোয়ে। প্রাণচঞ্চল এই জয়ীতার তেজদীপ্ত পথচলা আরও প্রস্ফুটিত হোক শিল্প-সুন্দরের মসৃণতায়। তার জন্য অশেষ শুভকামনা.....