বিশেষ সংবাদ:

যাত্রানটের কাব্যবিলাস

Logoআপডেট: বুধবার, ১০ জুন, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
এক জীবনে কতো-কি। শিল্পের অলিগলি ছুটেচলা এমন দুরন্ত পথিক ক’জনইবা আছে। জীবনের পুরোটা সময়কেই যিনি ধ্যান-জ্ঞান ভেবে চলেছেন সংস্কৃতির অনবদ্য সেবায়।

 

যাত্রাঙ্গনে কৈশর-যৌবন পার করে পরিণত বয়সেও তিনি শিল্প-সাধনায় অবিচল। এবার নিজেকে মেলে ধরেছেন আবৃত্তির নতুন ইতিহাসে। বলছি যাত্রাশিল্পের জীবন্ত কিংবদন্তি মিলনকান্তি দে’র কথা।

 

শতাধিক যাত্রাপালায় সুঅভিনয়ের পাশাপাশি গুণধর যাত্রানির্দেশক এবং একজন দক্ষ সংগঠক ছাড়াও দূরদর্শী শিল্প-সমালোচকের তোকমা রয়েছে তার ব্যক্তিত্বে। গেল একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার লেখা গ্রন্থ ‘যাত্রাশিল্পের সেকাল-একাল’। বাংলার মাঠ-ময়দানের মঞ্চ দাপটানো এই যাত্রানট এবার যেন আর্বিভূত হলেন নতুন ঝলকে।

 

নগরীর সেগুন বাগিচাস্থ জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার হলে ৯ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছিল যাত্রাব্যক্তিত্ব মিলনকান্তি দে’র একক আবৃত্তিসন্ধ্যা। আয়োজনকে ঘিরে মিলনায়তন জুড়ে দেখাদেয় আবৃত্তি তথা সংস্কৃতিপ্রেমী বিশিষ্টজনদের মিলনমেলা। যাত্রা সংগঠন দেশ অপেরার আয়োজনে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। মঞ্চসারথি আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে যোগদেন কথাসাহিত্যিক রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, নাট্যরতœ লিয়াকত আলী লাকী, আবৃত্তিকার ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়।

 

ব্যতিক্রমী এই আবৃত্তি আসরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের আবৃত্তির ইতিহাসে মিলন কান্তি দে বসিয়ে দিলেন নবপালকের ছাপ। কেননা, দেশের আবৃত্তিচর্চায় মাঝে-মধ্যে দীর্ঘ কবিতাপাঠ ও আবৃত্তি আনুষ্ঠান হয়ে থাকলেও মিলনকান্তি দে’র এ আয়োজনের মত এতো দীর্ঘ এবং ১৫টি কবিতা মুখস্ত একক আবৃত্তিসন্ধ্যা বিরল।

 

যা রীতিমতো উপভোগকারীদেরও হতবাক করেছে। তিনি কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে পুনরুজ্জীবিত করেছেন সময়কে, শব্দের গাঁথুনিকে। কবিতাগুলোর সারাশরীরে যেন প্রগাঢ় ভালোবাসা জড়িয়ে-ছড়িয়ে করেছেন একাকার। কন্ঠের কারুময়তায় মোটেও পাত্তা পায়নি বয়সের ছাপ। পরিচ্ছন্ন উচ্চারণ, শাব্দিক গভিরতা, প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি এমনকি কাব্যিক শিল্পঢংয়ে হলপূর্ণ দর্শকদের অভিভূত করে তোলেন মিলনকান্তি দে।

 

শুরুতে যেমনি তার কন্ঠে ভেসে ওঠে- মহাকবি মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গ। যেখানে রাবণের পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দিয়েই কাব্যকাহিনীর সূত্রপাত। এই দীর্ঘ সর্গের মধ্যে রাবণের বিলাপ এবং আক্ষেপই যেন প্রতিস্থাপিত হয়েছে মিলন কান্তির কাব্যবুলিতে। এরপর একে একে রবি ঠাকুরের ’নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ’দেবতার গ্রাস’, ’সামান্য ক্ষতি’, কাজী নজরুলের বিদ্রোহী, ’মানুষ’, ’খেয়াপাড়ের তরণী’, জীবনানন্দ দাসের ’রুপসী বাংলা’, ’বনলতা সেন’, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ’ছাড়পত্র’, ’উদ্যোগ’, শামসুর রাহমানের ’অভিশাপ দিচ্ছি’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ’কেউ কথা রাখেনি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’, ‘নুরুলদিনের সারা জীবন’, কাব্যনাট্যের প্রস্তাবনা- নিলক্ষা আকাশ নীল’ এবং নির্মলেন্দু গুণের ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’।

 

বর্ণীল এ আয়োজন প্রসঙ্গে মিলনকান্তি দে বলেন, মূলত, ষাটের দশকে আবৃত্তির মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার পথচলা শুরু। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে আমি প্রথম কবিতা আবৃত্তি করি। সেসময় বাঙালির গণআন্দেলনে চট্টগ্রামে বহু সভা-সমাবেশে আবৃত্তি করেছি। পরে ঘটনাচক্রে আমি যাত্রাঙ্গনে চলে যাই।

 

তিনি বলেন, আমার এ আবৃত্তিসন্ধ্যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘অন্তর মম বিকশিত কর আন্তরতর হে’। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আমাদের মন-প্রাণের বিকাশ ও শুদ্ধতার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে পরম প্রার্থনা করতে হবে। কবিতা হচ্ছে কবির সৃষ্টিশীল বৈচিত্রতা ও শিল্পভাবনার অনবদ্য বর্হিপ্রকাশ। কবির অমর লেখনিকে আবৃত্তিকার তার বাকশৈলীতে কল্ললিত করে তোলে। সব চেয়ে বড় কথা হলো- কবিতা ও আবৃত্তি হচ্ছে সুন্দরের প্রকাশ এবং অশুভ ও অপশক্তি মোকাবিলায় শাণিত কৃপাণ। তাছাড়া একজন যাত্রাশিল্পী হিসেবে আমি মনে করি অভিনয়ের জন্য আবৃত্তিচর্চা খুবই জরুরী।