বিশেষ সংবাদ:

মহান একুশের অনুপ্রেরণাই ছিল স্বাধীনতার অর্জনের মূল শক্তি

Logoআপডেট: সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সালেহ উদ্দিন ভূঁইয়া

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়
কইতো যাহা আমার বাবায়
কইতো যাহা আমার দাদায়
কও দেখি ভাই সে মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়?’
লক্ষ্য করার বিষয়, এই গানে বাংলাকে শুধু নিজের মুখের ভাষা নয়, বাপ-দাদার ভাষা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঙালির মুখে তাই অন্যভাষা শোভা পায় না বলা হয়েছে। এটাই ছিল বাংলাদেশের তখনকার গণমানুষের মনের কথা।
মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ ও প্যারা মিলিশিয়া যখন ঢাকার শহীদ মিনারটি রাতে এসে বারবার ভাঙছে, তখন দিনের বেলা শত শত নর-নারী এসে সমবেত হয়েছে এই ভাঙা শহীদ মিনারের সামনে। মিনার পুনর্নির্মাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি সাদা চাদর পেতে রাখা হতো। তাতে মানুষ অকাতরে টাকা-পয়সা ঢালছে। এমনকি খেটে খাওয়া মজুরের স্ত্রী এসে হাতের রূপার বালা খুলে চাদরের ওপর রাখছে। মধ্যবিত্ত ঘরের গৃহিণীরা নয়, এই চাদরে অকাতরে টাকা-পয়সা, গয়নাগাঁটি ঢেলেছে গরিব ঘরে বৌঝিরা বেশি।
এই ভাষা আন্দোলন থেকেই তাই পরবর্তীকালে বাঙালির সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা, যা পরে স্বাধীনতার যুদ্ধে পরিণত হয়। যে যুদ্ধে দেশের একজন কৃষকের সন্তানও এক কাঁধে লাঙল এবং আরেক কাঁধে রাইফেল নিয়ে অংশ নিয়েছে।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটনের      প্রস্তাবিত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রকাশ করা হলে ঠিক তার অব্যবহিত পরে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহম্মদ দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ রাজ্যের সেকেন্দ্রবাদ শহরে আয়োজিত এক উর্দু সম্মেলনে এই মর্মে ভাষণ দেন যে, প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে ‘একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা থেকে লিখিত প্রতিবাদ পেশ করেন ভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই জ্ঞানগর্ভ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
এই নিবন্ধের শিরোনাম ছিল- ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’। এই নিবন্ধেই প্রথম বলা হয়- বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি। এরপর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ যখন করাচিতে গণপরিষদে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ মর্মে প্রস্তাব পাশ করা হয় তখন কুমিল্লার অকুতোভয় রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সোচ্চার কন্ঠে এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করার ইতিহাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম অমর হয়ে থাকবে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে এ দেশের ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। পাকিস্তানি জুলুমবাজ সরকার রাষ্ট্রভাষার এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য নির্বিচারে গুলি চালায় নিরীহ বাঙালি জাতির ওপর। বাঙালির রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে যায়। শহীদ হন আবুল বরকত, জব্বার, রফিক, সালাম ও আরও কয়েকজন, আহত হন শতাধিক ভাষাসৈনিক।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি গুলিবর্ষণের পর ঢাকা নগরী এক ভয়াল রূপ ধারণ করে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্ররা মাইক লাগিয়ে বক্তৃতা শুরু করে এবং ছাত্রদের সমর্থনে মহল্লার অধিবাসীরা দলে দলে এগিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে দোকানপাট-যানবাহন চলাচল সবকিছুই বন্ধ হয়ে যায়। স্রোতের মতো মানুষ এগিয়ে আসে হাসপাতালের দিকে। হাসপাতালে আগত সব মানুষের মুখে তখন শোকের কালো ছায়া, সবার চোখেই ক্রোধের আগুন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি সংঘটিত হত্যাকান্ডের পর পাকিস্তানি সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। অতঃপর ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সরকার বাংলাকে অন্যতর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম ১৯৭০ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি রাত ১২টা ১ মিনিটে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের রেওয়াজ প্রচলন করেন। এই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর খালি পায়ে প্রভাতফেরি ২০ ফেব্র“য়ারি রাত ১২টা ১মিনিট থেকে পরদিন ২১ ফেব্র“য়ারি দুপুর ২টা পর্যন্ত- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি’ অমর একুশের গান গেয়ে। যার রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। আজ এ অমর একুশের গান গাওয়া হয় ১৮৮ দেশে ২১ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) সাধারণ পরিষদ তার ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থনে সর্বসম্মতভাবে ‘একুশে ফেব্র“য়ারি’কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কোর প্রস্তাবে বলা হয়, ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং ১৯৫২ সালের এই দিনের শহীদদের স্মৃতিকে সারা বিশ্বে স্মরণীয় করে রাখতে একুশে ফেব্র“য়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রতি বছর একুশে ফেব্র“য়ারি ইউনেস্কোর ১৮৮টি সদস্য দেশ এবং ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হবে’। ইউনেস্কোর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২০০০ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি বিশ্বব্যাপী প্রথম পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলেই একুশে ফেব্র“য়ারি লাভ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অসামান্য গৌরব। শেখ হাসিনার এই কৃতিত্ব বাঙালি জাতি কোনোদিনই ভুলতে পারবে না।
বাংলা ভাষা আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বাঙালি জাতি মৃত্যুর ভয়কে জয় করে ফেলে। ভাষা আন্দোলনের সাহস থেকে বাঙালি জাতি সোচ্চার হয়ে ওঠে জঙ্গি পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে। তারই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ সাহসী বাঙালির। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তাই মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার ইতিহাসও বটে।

লেখকঃ ১৯৭২ সালে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জি.এস।