বিশেষ সংবাদ:

‘ডিয়ার লায়ার’ বাংলাদেশের মঞ্চে নতুন সংযোজন

Logoআপডেট: শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব

পত্রমিতালি বা চিঠি আদান-প্রদানের প্রচলন যুগ যুগ ধরেই হয়ে এসেছে। সেসব এখন শুধুই স্মৃতির পাতা। একটা সময় ডাক হরকরা এসে চিঠি পৌঁছে দিতো প্রকৃত পাপকের হাতে। সেসব চিঠিতে থাকতো গভীর আবেগ-অনুভূতি, স্নেহ- ভালোবাসা এমনকি শ্রদ্ধা কিংবা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খামবন্দি শব্দমালায় ঘেরা সেই চিঠি বা কাগজের টুকরোর ভাঁজে ভাঁজে আপনজনের স্পর্শ ও অনুভূতি খুঁজে পেত মানুষ। সবই এখন আবছা অতীত। তবে, সেই অতীত ঐতিহ্যের শৈল্পিক রসায়ন দেখা গেল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলো-আঁধারিতে এই চিঠি চালাচালি করেন মঞ্চ ও টিভি মিডিয়ার জনপ্রিয় অভিনেত্রী অপি করিম এবং অভিনেতা-নির্দেশক আতাউর রহমান।

জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার হলে গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় নাট্যম রেপার্টরির ৬ষ্ঠ প্রযোজনা ‘ডিয়ার লায়ার’-এর উদ্বোধনী প্রদর্শনী।সময়টা আঠারো শতকের শেষ এবং উনিশ শতকের শুরু। খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ এবং ওই সময়ে বিখ্যাত বৃটিশ মঞ্চাভিনেত্রী প্যাট্রিক ক্যাম্পবেল স্টেলারের মধ্যে গভীর প্রেম চলছিল। তাদের পরস্পরকে পাঠানো চিঠিগুলো থেকেই বিষয়টি জানা যায়।‘ডিয়ার লায়ার’ নাটকটি তাদের আলোচিত সেই প্রেমপত্র অবলম্বনে লেখা।

মার্কিন লেখক জেরোম টিমোথি কিল্টির মূল লেখা থেকে নাটকটি অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম।এই নাটকে অপি করিম হাজির হন ব্রিটিশ অভিনেত্রী ‘প্যাট্রিক ক্যাম্পবেল স্টেলা’ হয়ে এবং ‘জর্জ বার্নার্ড শ’ হিসেবে দেখা মিলে মঞ্চসারথী আতাউর রহমানকে। এর আগে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং সৈয়দ শামসুল হক রচিত নাগরিকের ‘অপেক্ষমাণ’ নাটকে তারা একইসঙ্গে অভিনয় করলেও এই নাটকে দর্শকদের পাশাপাশি গুণধর দুই অভিনয়শিল্পী নিজেরাই নিজেদের আবিষ্কার করেন নতুনরূপে।

এটিকে শ্রুতি নাটক হিসেবে মঞ্চে এনেছেন প্রতিশ্রুতিশীল নাট্যনির্দেশক ড. আইরিন পারভীন লোপা। ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ব্যপ্তির এ নাটকটি মূলত একইসাথে মঞ্চাভিনয় ও পাঠাভিনয়ের মিশেলে আবৃত। দৃষ্টিনন্দন ও হালকা সেটের এ দৃশ্যকাব্যে উভয় শিল্পীর হাতেই প্রপস হিসেবে দেখা যায় চিঠি। সেসব চিঠি পড়ার ঢংয়ে অল্প-বিস্তর মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে নাটক এগিয়ে যায় প্রেম ও গল্পের গভীরে। এক্ষেত্রে দুই প্রজন্মের দুই অভিনয়শিল্পী চিঠির পরম্পরায় পারস্পরিক দুর্বলতা, আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উৎকণ্ঠার চমৎকার রসায়ন তৈরি করেন অনবদ্য অভিনয়কারুতে। তাদের কণ্ঠসৃত সে চিঠিকাব্যের শৈল্পিকবুননে উপভোগীরাও একাত্মার হয়ে ওঠেন গল্পের ভাঁজে ভাঁজে। তবে একাধিকবার দুই অভিনয়শিল্পীর সংলাপ আওড়ানোতে বিভ্রাট ঘটে।

এক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজেকে সামলিয়ে দাপুটে অভিনয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন তারকা অভিনেত্রী অপি করিম। গল্পের কারণে দু এক জায়গায় নাটকের গতি শ্লথ হয়ে উঠলেও মাঝে মাঝে অন্তরীক্ষ ছুঁয়ে যাওয়ার মত অনবদ্য সংলাপ উপস্থিত দর্শকদের সজাগচিত্তকে সরব রাখে।নাটকে জর্জ বার্নার্ড শ’ চরিত্রে ৭৭ বছর বয়সী মঞ্চসারথির প্রাণবন্ত অভিনয় যেন এই প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের জন্য অনন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে ধরা দেয়।

পুরো নাটকটিই ছিল বাংলাদেশের মঞ্চে নতুন সংযোজন। খুটিনাটি বিষয় এড়িয়ে গেলে পাঠাভিনয়ের পাশাপাশি অভিনব উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নির্দেশক লোপা তার নিজস্বতাকে প্রমাণ করেছেন স্বাতন্ত্রিক মানদণ্ডে। যা এর আগেও তার নির্দেশিত ‘সারস ডানার পরান পাখি’ এবং ‘আমি’সহ একাধিক নাটকে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। নাটকের পোশাক ও আলোকায়ন ছিল যথার্থ ও দৃষ্টিনন্দন। ঘটনাবৃত্তের নানা বাঁকে উঁকিমারা আবহসঙ্গীতও ছুঁয়ে গেছে উপভোগীদের চিত্ত।

পাশাপাশি মঞ্চসজ্জা ও রূপসজ্জায় ছিল যথেষ্ট মুনশিয়ানা। কথায় আছে একটি নতুন নাটক আট-দশটি প্রদর্শনীর আগে কখনোই উল্লেখযোগ্য পরিচ্ছন্নতা পায় না, সেক্ষেত্রে প্রথম প্রদর্শনীতেই এই প্রযোজনাটি অনেকটাই উৎরিয়েছে। দেশের নাট্যমঞ্চে এমনি সাহসী একটি প্রযোজনা নিয়ে আসার জন্য নাট্যম তথা সংশ্লিষ্টদের প্রতি জানাই নিরন্তর ভালোবাসা।