বিশেষ সংবাদ:

সমকালের সবচেয়ে নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই, ২০১৮

এবি প্রতিবেদক
সৃজন-সৃষ্টির অনবদ্য আলোয় উজ্জ্বল তিনি। শরীরী অস্তিত্ব না থাকলেও বেঁচে আছেন আপন শিল্প-সাহিত্যের ভুবনে, কোটি মানুষের অন্তরে, জীবন্ত-প্রাণবন্ত হয়ে। সরল রেখার মতোই সহজ লেখায় মোহাবিষ্ট করেছিলেন পাঠক কিংবা দর্শককে। 

একইসঙ্গে সাহিত্য ও শিল্পকে ধারণ করে হেঁটেছেন বর্ণময় পথে। সমৃদ্ধ করেছেন এদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পকে। তার গল্প, উপন্যাস, নাটক বা চলচ্চিত্রে উদ্দীপক আর রহস্যময় বুনটে বিভোর করে রেখেছেন অগণিত পাঠক-দর্শকদের। তিনি জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ।

সাহিত্যাঙ্গনের এই কিংবদন্তি জন্মেছিলেন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। তার বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। তার বাবা লেখালিখি করতেন ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করতেন।

একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন দেশের সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। পাশাপাশি বিচিত্র বিষয়ের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিল্পরসিকদের দিয়েছেন অফুরন্ত আনন্দময়তা। দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে একজন লেখক হিসেবে প্রায় সবই তিনি অর্জন কিংবা জয় করে নিয়েছিলেন। তার রচনাসমগ্রে আজো বিভোর আর বিস্মিত হন সব প্রজন্মের পাঠক। লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প। তার ছোট গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। ভৌতিক গল্পেও জুড়ি নেই হুমায়ূনের। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’ জনপ্রিয়তায় বিশ্ব সাহিত্যেও বিস্ময়। এর বাইরে কবিতা এবং গান লেখাতেও হাত চালিয়েছেন তিনি। এভাবেই ক্রমাগত সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জননন্দিত সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র জীবনে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার ২য় গ্রন্থ। তারপর থেকে যেখানেই হাত দিয়েছেন হুমায়ূন, সেখানেই সোনা ফলেছে। সময়ের অববাহিকায় দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থ । যা বিশ্ব সাহিত্যে একজন লেখক হিসেবে তাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা।

আজ বুধবার বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকারের ৬ষ্ঠ প্রয়াণবার্ষিকী। ২০১২ সালে ১৯ জুলাই বর্ষার রাতে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অদেখার ভুবনে পাড়ি জমান হুমায়ূন আহমেদ। পাঠক, ভক্ত, পরিবার-পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের অশ্রুধারায় সিক্ত করে বিদায় জানান প্রিয় পৃথিবীকে। বৃষ্টি ও জ্যোৎস্নাপ্রিয় এই সাহিত্যস্রষ্টা নিজ হাতে গড়া নন্দনকানন নুহাশ পল্লীর লিচুতলার ছায়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
আজ লেখকের মৃত্যুদিবসে গাজীপুরের নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় তার সমাধিক্ষেত্র ভরে উঠবে ফুলে ফুলে। ভক্ত ও অনুরাগীরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ও দোয়া কামনার মাধ্যমে লেখকের প্রতি জানাবেন অফুরান ভালোবাসা। প্রতিটি জাতীয় পত্রিকায় তার মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে ছাপা হয়েছে প্রতিবেদন। লেখকের এই প্রয়াণবার্ষিকীতে টিভি চ্যানেলগুলো নাটকসহ নানা আয়োজনে জানাচ্ছে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

আত্মজৈবনিক গ্রন্থে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন- ‘কল্পনায় দেখছি নুহাশ পল্লীর সবুজের মধ্যে শ্বেতপাথরের কবর- তার গায়ে লেখা- ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে’। সে কথাগুলো কাঁচের এপিটাফ করে তার সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন নিজের নক্সায় সাজিয়েছেন স্বামীর কবর। সেখানে আজ শাওন ও তার দুই শিশু পুত্র নিনিদ ও নিষাদের ফুলের ছোঁয়া পাবেন ঘুমন্ত হুমায়ূন। তারপর হাজারও মানুষ নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় বিনম্র শ্রদ্ধা জানাবেন প্রিয় লেখককে। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নুহাশ পল্লীর পাশ্ববর্তী এতিমখানার অনাথ শিশুদের খাওয়ানো হবে হুমায়ূন আহমেদের পছন্দের খাবার। থাকবে কোরান তেলাওয়াত ও দোয়া প্রার্থনার আয়োজন। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশ, অনন্যা, অন্বেষা, কাকলী ও সময়সহ কয়েকটি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারীরা প্রিয় এই লেখকের প্রতি মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানান। এরারও যথাযোগ্য মর্যাদায় তাই হবে। হুমায়ূন ভক্তদের গড়া হিমু পরিবহন নামের সংগঠনের পক্ষ থেকেও লেখকের প্রয়াণবার্ষিকীতে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি।
এছাড়া হুমায়ূনের জন্মস্থান নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচী। এ সবের মধ্যে রয়েছে লেখকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোক শোভাযাত্রা, মিলাদ মাহফিলসহ নানা আয়োজন।

হুমায়ূন আহমেদ পাঠক বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটলেও তার শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন নিজের বিরল প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর। বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জনকও বলা হয় তাকে। সাহিত্যের যে ক্ষেত্রেই তিনি সৃজনের পদচিহ্ন এঁকেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের চূড়ো দেখা পেয়েছেন ।

তিনি ছিলেন পাঠক তৈরির জাদুকর। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষকে তিনি জাদুময় লেখায় আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। মানুষের প্রাণে প্রাণে মিশে থাকা নন্দিত এই কথা সাহিত্যিক স্ব শরীরে না থাকলেও তার অস্তিত্ব এবং লেখার শক্তি অমলিন হয়ে আছে অগণিত পাঠক-ভক্তের অন্তরীক্ষে। এখনও লাখো পাঠক তার জন্য কাঁদেন। এটাই একজন কথাসাহিত্যিকের পরম প্রাপ্তি। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম লেখকই মানুষের এমন ভালোবাসা পেয়ে থাকেন। বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে, ততদিন স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন দেশীয় সাহিত্যে নতুন যুগের এই স্রষ্টা।

বাংলা সাহিত্যকে সার্বজনীন করে তুলতে কিংবদন্তি এই কথাশিল্পীর অবদান বাঙালির সৃজনে মননে থাকবে চিরঅম্লান হয়ে। জননন্দিত এই কথাশিল্পীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।