বিশেষ সংবাদ:

বাঙালির অনন্য সাহিত্যরত্ন মহাকবি কায়কোবাদ

Logoআপডেট: শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১৮

এবি প্রতিবেদক
মুহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী ওরফে কায়কোবাদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সাহিত্যধারার সূচনা পাঠের শ্রেষ্ঠ কবি। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী, ‘কায়কোবাদ’ তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম। মূলত, কায়কোবাদ ছিলেন একজন প্রেমিক কবি, বেদনার কবি, একজন আধ্যাত্মিক সাধক কবি।

স্বদেশ প্রেম, সত্যনিষ্ঠা আর ইতিহাস ঐতিহ্য প্রীতি ছিল তার কবি প্রতিভার মৌল বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথেরও বয়োজ্যেষ্ঠ কবি কায়কোবাদ গীতি কবি হিসাবেই সাহিত্য ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন এবং রবীন্দ্রযুগেই মহাকাব্য রচয়িতা রূপে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মূলত গীতিকবি হলেও মহাকাব্য রচনায় তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্যই তিনি সকলের প্রশংসা ও বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আজ ২১ জুলাই মহান এই কবির ৬৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫১ সালের এইদিনে আজকের ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। তিনি বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রথম সনেট রচয়িতা। কায়কোবাদের জন্ম ১৮৫৭ সালে ঢাকা জেলার নওয়াবগঞ্জ থানার আগসা গ্রামে। বাবার নাম শাহমত উল্লাহ আল কোরেশী ওরফে এমদাদ আলী এবং মায়ের নাম জোমরাত উন্নেসা ওরফে জরিফুন্নেসা খাতুন।

কবির পিতৃপুরুষগণ বাদশাহ শাহজাহানের রাজত্বকালে বাগদাদের কোনো এক অঞ্চল থেকে ভারতে আসেন। তাদের মধ্যে মাহবুব উল্লাহ আল কোরেশী ফরিদপুর জেলার গোড়াইলে বসবাস শুরু করেন। কায়কোবাদ মাহবুব উল্লাহ আল কোরশীর প্রপৌত্র। কবির পিতামহের নাম নেয়ামত উল্লাহ আল কোরেশী। কবির বাবা ঢাকায় ওকালতি করতেন।
কায়কোবাদের বয়স যখন এগারো তখন তার মা এবং এক বছর পরেই বাবা মারা যান। ফলে পড়াশোনায় তেমন একটা এগোতে পারেননি কবি। তিনি ঢাকা পগোজ স্কুলে ও আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করেন এবং এন্ট্রাস পরীক্ষার পূর্বেই তার পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটে। কায়কোবাদের কবি জীবন শুরু সেই বাল্যকালে মাদরাসার ছাত্রাবস্থায়।

মাত্র তেরো বছর বয়সে তার প্রথম কাব্য বিরহবিলাপ (১৮৭০) প্রকাশিত হয়। পনের বছর বয়সে ১৮৭৩ সালে তিনি রচনা করেন তার দ্বিতীয় কাব্য ‘কুসুম কানন'। কবি জীবনের প্রথম পর্যায়ের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কাব্য ‘অশ্রুমালা' প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। এরপর তিনি মহাকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং ১৯০৪ সালে তার বিপুল আয়তনের মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান' প্রকাশিত হয়। ১৯১৪ সাল পর্যন্ত কায়কোবাদ কাব্যটির নানা আকৃতি ও প্রকৃতিগত পরিবর্তন সাধন করেন। ‘মহাশ্মশান' এর পরে তিনি রচনা করেন ‘শিব মন্দির' (১৯২১), ‘আময় ধারা' (১৯২৩), ‘মহররম শরীফ' (১৯৩৩) এবং ‘শ্মশান ভসন' (১৯৩৮) কাব্য। ‘মহররম শরীফ' কবির মহাকাব্যোচিত বিপুল আয়তনের একটি কাহিনি কাব্য।
মুসলমান কবি রচিত জাতীয় আখ্যান কাব্যগুলোর মধ্যে মহাকবি কায়কোবাদ রচিত ‘মহাশ্মশান’ কাব্যটি সুপরিচিত। কায়কোবাদের মহাকবি নামের খ্যাতি এই মহাশ্মশান কাব্যের জন্যই। কাব্যটি তিন খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে ঊনত্রিশ সর্গ,দ্বিতীয় খণ্ডে চব্বিশ সর্গ, এবং তৃতীয় খণ্ডে সাত সর্গ। মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ’ পৃষ্ঠার এই কাব্য বাংলা ১৩৩১, ইংরেজি ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়; যদিও গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে আরো ক’বছর দেরী হয়েছিল।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধযজ্ঞকে রূপায়িত করতে গিয়ে কবি বিশাল কাহিনি,ভয়াবহ সংঘর্ষ, গগনস্পর্শী দম্ভ,এবং মর্মভেদী বেদনাকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন। এতে বিশালতার যে মহিমা রয়েছে তাকেই রূপ দিতে চেয়েছিলেন এই কাব্যে। সেসময় কায়কোবাদ যেন এক নির্জিত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার লেখায় সমাজের মানুষ পেয়েছিল প্রেরণা ও পথের দিশা। সঙ্গীত রচনায়ও ছিল তার সিদ্ধহস্ত। তার গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে। কায়কোবাদের কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, যার প্রকাশ ঘটেছে তার বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। ১৯৩২ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ঊনিশ শতকের যুগস্রষ্টা বিপ্লবী কবি মাইকেল মধুসূধন দত্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা। পরবর্তীকালে তার ধারা অনুসরণ করে যারা মহাকাব্য রচনায় অগ্রসর হয়েছিলেন তাদের মধ্যে কায়কোবাদ ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রমধর্মী মহাকাব্য রচয়িতা। বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি হিংসা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার যে পরিপ্রেক্ষিত পেয়েছিলেন, তাকে তিনি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মহাশ্মশান সম্প্রীতির এক নবপ্রেক্ষিত নির্মাণে প্রয়াসী ছিলেন।

সময়ের বিপরীতে গিয়ে কায়কোবাদ এক অতুলনীয় সাম্যবাদের আনন্দ লোক নির্মাণ করেছিলেন। যেখানে হিন্দু মুসলমান একই দেশবাসী এবং একই প্রকৃতির মানবীয় গুণাগুণে বিভূষিত। তিনি তার কাব্যে যে আবেগে মুসলমানদের মনোবেদনা বর্ণনা করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর নিষ্ঠায় হিন্দুদের মনোবেদনা বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, হিন্দুদের দুর্বল করে অঙ্কন করলে শক্তিমান মুসলমানের কোন গৌরব নেই। কেননা, শৃগালের সঙ্গে যুদ্ধে সিংহের কোনো গৌরব নেই। কায়কোবাদ বাংলার অপর দুই মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের ধারায় মহাকাব্য রচনা করেন। তবে নবীনচন্দ্রই ছিলেন তার প্রধান আদর্শ।
বাংলা কাব্য সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সঙ্ঘ তাকে কাব্যভূষণ, বিদ্যাভূষণ ও সাহিত্যরত্ন (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয় এবং আজিমপুর কবরস্থানে তিনি চিরশয্যায় শায়িত। তার মত দীর্ঘ জীবন লাভের সৌভাগ্য খুব কম লেখকের জীবনেই ঘটে।

কিন্তু তার এই দীর্ঘ জীবন পরিসরে পরিবর্তনশীল জগত ও সাহিত্যোদর্শের খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিশ শতকের পরিবর্তিত পরিবেশে অবস্থান করেও তিনি ছিলেন ঊনিশ শতকীয় সাহিত্যাদর্শ ও সাহিত্য রীতির অনুসারী ছিলেন। অনন্য সৃজন-সৃষ্টির জন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্তকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন মহাকবি কায়কোবাদ। তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।