বিশেষ সংবাদ:

প্রেম ও রাজনীতির কবি পাবলো নেরুদা

Logoআপডেট: রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব 
বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। চিলিয়ান এই কবি ও রাজনীতিবিদ রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাস্তেহারও। তার রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। ১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে ‘বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি’ বলে বর্ণনা করেন। আজ ২৩ সেপ্টেম্বর পাবলো নেরুদার প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৩ সালের এই দিনে হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই চিলির পাররাল শহরে জন্ম নেয় নেরুদা। তার প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তার ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। পারিবারিক অনীহার কারণে তিনি ছদ্মনাম গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

তার পিতা ডন হোসে কারমেন একজন রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার মা রোসা বাসোয়াল্তো দা রেইয়েস শিক্ষকতা করতেন। পাবলোর জন্মের কয়েক সপ্তাহ পরেই তার মায়ের মৃত্যু হয়। ১৯০৬ সালে তার পিতা টেমাকো শহরে গিয়ে বসত গড়েন। সেখানে তিনি পুনরায় বিয়েও করেন। নেরুদার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভকাল পিতা ও সৎ মায়ের সঙ্গে এই টেমাকো শহরেই কেটেছে। দশ বছর বয়সে তিনি কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু তার পিতা কবিতার প্রতি তার এই আগ্রহ পছন্দ করতেন না।

১৯২৩ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, প্রকাশক না পেয়ে নেরুদা নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে বের করেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘টুইলাইট’। বইটি তাকে ব্যাপক প্রশংসা ও পরিচিতি এনে দেয়। পরের বছর এক প্রকাশক আগ্রহী হয়ে প্রকাশ করে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘টুয়েন্টি লাভ পোয়েম্স এন্ড এ সং অফ ডিসপেয়ার’। এই বইটি ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। বলা বাহুল্য, এটিই এখনও পর্যন্ত সারা বিশ্বে তার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত কবিতাগ্রন্থ। অনেকে এটাকেই তার মাস্টারপিস রচনা বলে অভিহিত করেন। পাবলো নেরুদা জীবৎকালেই কবি হিসেবে কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন।

কবি তার মূল পরিচয় হলেও রাজনীতিক হিসেবেও সমান সমাদৃত ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক আদর্শে ঘোর মার্কসবাদী। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। সিনেটর নির্বাচিত হন। একবার প্রেসিডেন্ট পদেও প্রার্থী হয়েছিলেন, যদিও জোট-রাজনীতির কবলে পড়ে তাকে শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। তাকে ‘প্রেম ও রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার রাজনৈতিক দর্শন তাকে সমাজতান্ত্রিক ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়। নেরুদা পুরোপুরি সক্রিয় রাজনীতি করেছেন, রাজনৈতিক কবিতাও লিখেছেন, কিন্তু সাহিত্যের উৎকর্ষের ক্ষেত্রে কখনও আপোষ করেননি। চরম আনন্দের সময়ও নেরুদা তার কবিতায় নিরানন্দাÍক চিত্রকল্পের আশ্রয় নেন। কিন্তু ভিন্ন আলোকে দেখলে প্রতীয়মাণ হয় যে, তার কবিতা ও চিত্রকল্পগুলো আসলে জীবনের ট্র্যাজিডির বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম, কিন্তু শক্তিশালী, প্রতিবাদ।

জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ঠ সহকারীতে পরিণত হন।

উল্লেখ্য, চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তার। কিন্তু কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনকি এই মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। দাবি করা হয়- ক্যান্সারে মৃত্যু হয়নি নেরুদার। নেরুদার দেহাবশেষ থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের মধ্যে একদল ফরেনসিক গবেষক দাবি করেছেন, প্রস্টেটের ক্যান্সারে মৃত্যু হয়নি নেরুদার। এর ফলে ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী নেরুদার মৃত্যু ঘিরে শুর ‍হয় রহস্য। ঠিক কী কারণে নেরুদার মৃত্যু হয়েছে, সেই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি গবেষক দল। তবে তাকে পরিকল্পিত খুনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেন না তারা।

১৯৭৩ সালে তার মৃত্যুর পর জানানো হয়েছিল নেরুদা প্রস্টেটের ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। কিন্তু একনায়ক অগাস্টো পিনোশের ক্ষমতা দখলের দুই সপ্তাহের মধ্যে নেরুদার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল তখনই। কমিউনিস্ট নেরুদার প্রাক্তন গাড়িচালক ম্যানুয়েল আরায়া দাবি করেছিলেন- ক্যান্সার নয়, বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে এই কবিকে। তার দাবি, নেরুদা যখন ঘুমে ছিলেন, তখন তার দেহে ইনজেকশনের মাধ্যমে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল। আর এতেই ‍মৃত্যু ঘটে নেরুদার।