বিশেষ সংবাদ:

শেকড় সন্ধানী এক নিবিষ্ট কারুকারের নাম এস এম সুলতান

Logoআপডেট: বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব

জীবনের মূল স্রোত, সুর ও ছন্দ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বাঙালির গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার প্রতিচ্ছবি তার শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে অনবদ্য এক শিল্পালোয়ে।হ্যাঁ উপমহাদেশের অন্যতম কীর্তিমান চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের কথাই বলছি।

আজ ১০ অক্টোবর কিংবদন্তি এই চিত্রকরের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় বরেণ্য এই চিত্রশিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। নড়াইলের কুড়িগ্রামে তাকে শায়িত করা হয়। ১৯২৩ সালের ১০ই আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়ার এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে বাংলার এই কৃতিশিল্পী জন্ম লাভ করেন। পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান হলেও সবার কাছে তিনি এস এম সুলতান নামেই অধিক পরিচিত। তবে তার পারিবারিক ডাক নাম ছিল লাল মিয়া। প্রগাঢ় ও সাহসী জীবনবোধের এক নিবিষ্ট চিত্রকর ছিলেন তিনি।

দারিদ্র্যতার শত বাধা থাকা সত্ত্বেও ১৯২৮ সালে তার পিতা নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু পাঁচ বছরের মাথায় থেমে যায় পড়াশোনা। এরপর বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ ধরেন। এখানেই এস এম সুলতানের শুরু। চলতে থাকে বিভিন্ন দালানে দালানে ছবি আঁকা।দশ বছর বয়সের স্কুল জীবনে, স্কুল পরিদর্শনে আসা ড. শাম্যপ্রসাদ মুখার্জির ছবি এঁকে সবার তাক লাগিয়ে দেন।
দরিদ্র ঘরের সুলতানের ইচ্ছে ছিল কলকাতা গিয়ে ছবি আঁকা শিখবেন। এ সময় তার প্রতিভায় চমৎকৃত হয়ে এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৮ সালে এস এম সুলতান কলকাতায় চলে আসেন। এ সময় কলকাতায় এসে তিনি ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতেই ওঠেন।

ইচ্ছে ছিল অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি শিল্পশিক্ষা। ফলে এ সময়টাতে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য প্রখ্যাত শিল্পী ও সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। সুলতানের শিক্ষার জন্য তিনি তার গ্রন্থাগারের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ১৯৪১ সালে শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তিন বছর আর্ট স্কুলে পড়ার পর তিনি ফ্রিল্যান্স শিল্পীর জীবন শুরু করেন।
আর্ট স্কুলের বাঁধাধরা জীবন তার ভালো লাগেনি। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও ভবঘুরে প্রকৃতির। ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বেড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে। ছোট বড় শহরগুলোতে ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের ছবি আঁকতেন। ছবি প্রদর্শনী ও ছবি বিক্রি করে চলত তার জীবন।

শিল্পী হিসেবে তিনি তখন কিছুটা পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু জাগতিক বিষয়ের প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড অনাগ্রহ। শিকড় ছড়াবার আগেই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন। আর তাই তখনকার আঁকা তার ছবির নমুনা, এমনকি ফটোগ্রাফও এখন আর নেই। তবে সেসময় তিনি নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রতিকৃতির ছবি আঁকতেন। কাশ্মীরে কিছুদিন থেকে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। সিমলায় ১৯৪৬ সালে তার আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়।
দেশ বিভাগের পর কিছু দিনের জন্য সুলতান দেশে ফেরেন। কিন্তু এর পরই ১৯৫১ সালে তিনি করাচিতে চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলে দু-বছর শিক্ষকতা করেন। সেসময় চুঘতাই ও শাকের আলীর মতো শিল্পীদের সাথে তার পরিচয় হয়। এর আগে, ১৯৫০ সালে তিনি আমেরিকায় চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন। এবং নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও পড়ে লন্ডনে তার ছবির প্রদর্শনী করেন।

১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে তার মোট বিশটি চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে একটি ছিল যৌথ প্রদর্শনী। যেখানে পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, মাতিস, ব্রাক ও ক্লির মতো বিশ্বনন্দিত শিল্পীদের চিত্রকর্মের সঙ্গে ছিল শেখ মোহম্মদ সুলতানের চিত্রকর্ম।
শিশুদের নিয়ে সুলতানের বহু স্বপ্ন ছিল। ১৯৫৩ সালে তিনি নড়াইলে ফিরে আসেন এবং শিশু শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। নড়াইলে তিনি নন্দন কানন নামের একটি প্রাইমারি ও একটি হাই স্কুল এবং একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের জন্য কিছু করার আগ্রহ থেকে তার শেষ বয়সে তিনি ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

গত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়। সেসময় শিল্পীরা উৎসাহ ও আগ্রহে বিভিন্ন কৌশল-রীতি, নিয়ম, ও ছবির মাধ্যমসহ নতুন নতুন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। সে সময়ও তিনি সকলের চোখের আড়ালে নড়াইলেই রয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতেন কিন্তু তার জীবনের মূল সুরটি ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে বাঁধা। গ্রামীণ জীবন থেকেই তিনি আবিষ্কার করেছেন বাঙালি জীবনের উৎস কেন্দ্রটি, বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদ, বিপ্লব ও সংগ্রাম, নানান প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস, অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ জীবনেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি। তিনি কৃষক পুরুষকে দিয়েছেন পেশীবহুল ও বলশালী দেহ আর কৃষক রমণীকে দিয়েছেন সুঠাম ও সুডৌল গড়ন, দিয়েছেন লাবণ্য ও শক্তি।

হয়তো তার দেখা দুর্বল দেহী, ম্রিয়মাণ ও শোষণের শিকার কৃষকদের দেখে কল্পনায় তিনি নির্মাণ করেছেন শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান কৃষক সমাজ। তার ছবিতে পরিপূর্ণতা ও প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি ছিল শ্রেণি বৈষম্য, গ্রামীণ জীবনের কঠিন বাস্তবতার চিত্র। তার আঁকা হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) ও চরদখল (১৯৮৮) এ রকমই দুটি ছবি।
এস এম সুলতানের উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে- জমি কর্ষণ-১, জমি কর্ষণ-২ (তেল রং ১৯৮৬, ১৯৮৭), হত্যাযজ্ঞ (তেল রং ১৯৮৭), মাছ কাটা (তেল রং ১৯৮৭), জমি কর্ষণে যাত্রা-১ এবং ২ (তেল রং ১৯৮৭, ১৯৮৯), যাত্রা (তেল রং ১৯৮৭), ধান মাড়াই (তেল রং ১৯৯২), গাঁতায় কৃষক (তেল রং ১৯৭৫), প্রথম বৃক্ষ রোপণ (তেল রং ১৯৭৬ ), চর দখল (তেল রং ১৯৭৬) পৃথিবীর মানচিত্র (তেল রং) অন্যতম।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সুলতান শিল্প রসিকদের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে যান। মধ্য সত্তরে তার কিছু ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় আঁকা তার কিছু ছবি দিয়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। মূলত এ প্রদর্শনীটিই তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ ছবিগুলোই তাকে নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি ও তাদের নন্দন চিন্তার রূপকার হিসেবে পরিচিত করে। তার ছবিতে কৃষকই হচ্ছে জীবনের প্রতিনিধি এবং গ্রাম হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র।
গ্রাম ও গ্রামের মানুষের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তার সৃষ্টির প্রেরণা। এজন্যই কৃষক ও তাদের জীবন একটি কিংবদন্তি শক্তি হিসেবে সকলের চোখে তার ছবিতে উঠে এসেছে। অবয়ব বা আকৃতিধর্মীতাই তার কাজের প্রধান দিক। তিনি আধুনিক ও নিরাবয়ব শিল্পের চর্চা করেননি। তার আধুনিকতা ছিল জীবনের অবিনাশী বোধ ও শিকড়ের শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা।

সুলতান নির্দিষ্ট নিয়মের প্রতি গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির উত্থানকে। উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই ও উপনিবেশিকোত্তর সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তুলে ধরেছেন। এটিই তার দৃষ্টিতে আধুনিকতা। তিনি ইউরো কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের ন্যায় খুঁজেছেন মানবের কর্ম বিশ্বকে। সুলতানের মতো আর কেউ আধুনিকতার এমন ব্যাখ্যা দেননি।
তার মতো মাটির কাছাকাছি জীবন তার সময়ে আর কোনো শিল্পী যাপন করেননি। সুলতান তেলরঙ ও জলরঙের ছবি এঁকেছেন। ব্যবহার করেছেন সাধারণ কাগজ, সাধারণ রঙ ও চটের ক্যানভাস। এজন্য তার অনেক ছবি নষ্ট হয়ে যায়। সেদিকেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

শিল্পী এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি তাকে আবাসিক শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ শিল্পী এস এম সুলতানকে সম্মাননা প্রদান করে। এ ছাড়াও তিনি অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যেটে ইন্সটিটিউটে সুলতানের একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আশির শেষ দিকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোন’-এ তার শেষ প্রদর্শনীটি হয়। সে বছর আগস্ট মাসে ব্যাপক আয়োজন করে তার গ্রামের বাড়িতে তার জন্মদিন পালন করা হয়। এ বছরের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কীর্তিমান এই চিত্রকরের মৃত্যু হয়।