বিশেষ সংবাদ:

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিরল এক প্রতিভা

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব

‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি’ বহুল পঠিত এই কবিতার রচয়িতা কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বিশ শতকের শেষার্ধে আবির্ভূত প্রথিতযশা এই বাঙালি সাহিত্যিক আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ-পরবর্তী অন্যতম প্রধান কবি। তিনি আধুনিক এবং রোমান্টিক ধাঁচের লেখার জন্য পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত।

বাংলাভাষী এই ভারতীয় সাহিত্যিক একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে অজস্র স্মরণীয় সাহিত্যসৃজন উপহার দিয়েছেন। যদিও তিনি পরিচিতি পেয়েছেন কবি ও ঔপন্যাসিক হিসেবে। বলা হয়ে থাকে সুনীল সব ধরনের লেখা লিখলেও মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন একজন কবি। আর তাই তরুণ কবি ও লেখকরা সবসময়ই তার প্রশ্রয় পেয়েছেন। পৃথিবীতে অখণ্ড বাঙালির আত্মপরিচয়ের যে-ক'জন ব্যক্তিত্ব ছিলেন বা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

আজ ২৩ অক্টোবর বাংলা সাহিত্যের নন্দিত এই লেখকের ৬ষ্ঠ প্রয়াণদিবস। ২০১২ সালের এই দিনে কীর্তিমান এই সাহিত্যিক হৃদযন্ত্রজনিত অসুস্থতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের মদারিপুরে। বর্তমান যা বাংলাদেশের অন্তর্গত। জন্ম বাংলাদেশে হলেও তিনি বড় হয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে যান।

পড়াশোনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। ছেলেবেলায় সুনীলের পিতা তাকে টেনিসনের একটা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন এখান থেকে দুটি করে কবিতা অনুবাদ করবে। এটা করা হয়েছিল তিনি যেন দুপুরে বাইরে যেতে না পারেন। সুনীলও তাই করতেন। বন্ধুরা যখন সিনেমা দেখত, বিড়ি ফুঁকত, সুনীল তখন পিতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করে দুপুরে কবিতা অনুবাদ করতেন। অনুবাদ একঘেঁয়ে হয়ে উঠলে তিনি নিজেই লিখতে শুরু করেন।

ছেলেবেলার প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতাটি তিনি দেশ পত্রিকায় পাঠালে তা ছাপা হয়। নীললোহিত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। নীললোহিতের মাধ্যমে সুনীল নিজের একটি পৃথক সত্ত্বা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। নীললোহিতের সব কাহিনিতেই নীললোহিতই কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে নিজেই কাহিনিটি বলে চলে আত্মকথার ভঙ্গিতে। সব কাহিনিতেই নীললোহিতের বয়স সাতাশ। সাতাশের বেশি তার বয়েস বাড়ে না। বিভিন্ন কাহিনিতে দেখা যায় নীললোহিত চির-বেকার। চাকরিতে ঢুকলেও সে বেশিদিন টেকে না। তার বাড়িতে মা, দাদা, বৌদি রয়েছেন। নীললোহিতের বহু কাহিনিতেই দিকশূন্যপুর বলে একটি জায়গার কথা শোনা যায়। যেখানে বহু শিক্ষিত সফল কিন্তু জীবন সম্পর্কে নিস্পৃহ মানুষ একাকী জীবনযাপন করেন।

 তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনন্য দিকপাল। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান মি. পলেন কলকাতায় এলে সুনীলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। সেই সূত্রে মার্কিন মুল্লুকে যান এবং ডিগ্রি নিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপগ্রন্থাগারিক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। তারপর থেকে সাংবাদিকতায় যোগ দেন সুনীল।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের কাহিনি চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অরণ্যের দিনরাত্রি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কাকাবাবু চরিত্রের চারটি কাহিনি সবুজ দ্বীপের রাজা, কাকাবাবু হেরে গেলেন?, মিশর রহস্য এবং ইয়েতি অভিযান চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ২০০২ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতা শহরের শেরিফ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ ও ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার এবং ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।

তার লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- পূর্ব-পশ্চিম, সেই সময়, প্রথম আলো, একা এবং কয়েকজন। আত্মজীবনীর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে- অর্ধেক জীবন, ছবির দেশে কবিতার দেশে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোচিত কবিতার মধ্যে- সুন্দরের মন খারাপ মাধুর্যের জ্বর, সেই মুহূর্তে নীরা, স্মৃতির শহর, সুন্দর রহস্যময় উল্লেখযোগ্য।

তার লেখা কবিতাগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘আমার স্বপ্ন’, ‘জাগরণ হেমবর্ণ’, ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘ভালোবাসা খণ্ডকাব্য’। এ ছাড়াও নাটক, গল্প, প্রবন্ধসহ অসংখ্য সাহিত্য রচনা করেছেন।

১৯৭২ ও ১৯৮৯ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ৬ষ্ঠ প্রয়াণদিবসে প্রথিতযশা এ কবি ও সাহিত্যিকের প্রতি বিনম্র-শ্রদ্ধা।