বিশেষ সংবাদ:

সৌমিত্রময় ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসব’

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
‘অভিনয় আবৃত্তিসহ নানা কারণে এদেশে বহুবার এসেছি। যতবার এসেছি, ততবারই আপ্লুত হয়েছি মানুষের অপরিমেয় ভালবাসায়।

 

প্রথমবার যখন এসেছিলাম, সেবার কেঁদেছিলাম। আমারই মতো সব মানুষ, ভাষা এক; সংস্কৃতি এক কিন্তু দুই দেশের বাসিন্দা। বিষয়টি আমাকে তা খুব পীড়া দেয়।

 

এখানকার মানুষের আন্তরিক আদর-সমাদরের অত্যাচারে আমি মুগ্ধ। বাঙালিদের মতো এতোটা ভালোবেসে আপনকরে আদর-আপ্যায়ন করার মতো জাতি পৃথিবীতে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।’

 

সম্প্রতি ঢাকায় এসে বাংলাদেশ সম্পর্কে এভাবেই বললেন ওপাড়বাংলার কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। চতুর্থবারের মতো নাটকপাড়া খ্যাত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় চলছে ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। ৪-১২ সেপ্টেম্বর ৯ দিনব্যাপী এ সাংস্কৃতিকযজ্ঞের উদ্বোধনীতে আবেগাপ্লুত কন্ঠে তিনি এসব কথা বলেন।

 

গত ক’দিন ধরেই বাংলাদেশের মিডিয়া যেন মেতে ওঠে সৌমিত্র আরাধনায়। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইন্ডিয়াপ্রীতি দর্শকদেরও উপছেপড়া কোলাহল। উৎসবের প্রথম দু’দিন নাটকপাড়ায় এমন উদ্দেলীত দর্শকঢল দেখে সংশ্লিষ্টদের সাথে নাটকের নিয়মিত দর্শকদের চোখও যেন কপালে ওঠে। কেননা, নাটকপাড়ার নিয়মিত দর্শকরা এসে নাটক শুরুর ২ঘন্টা আগেও দ্যাখে যে, টিকিট কাউন্টারে নোটিশ ঝুলানো- ‘আজকের নাটকের টিকেট নেই।

 

উৎসবের অন্যান্য দিনের নাটকের অগ্রিম টিকেট পাওয়া যায়’। দেশের মঞ্চনাটকের তীর্থস্থান জাতীয় নাট্যশালায় যেখানে দেশের বহু স্বনামধন্য থিয়েটার দলই তাদের শিল্পসফল বেশিরভাগ নাটকেই আশানরুপ দর্শক পায়না, নিয়মিত ভূর্তুকী দিয়ে প্রদর্শনী চালাতে হয়, সেখানে একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পকলায় নাটক দেখতে গণঢল পড়বে, টিকেটের জন্য হাহাকার লাগবে- এমনটিতো সচরাচর ঘটেনা, কিন্তু কেন? উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে ভারতীয় নাটক হওয়ায় এবং সেখানে উপমহাদেশখ্যাত নাট্যজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করবে বলেই এমন দর্শক স্রোত।


ভারতীয় কিংবা ভিনদেশী কোন সেলিব্রেটি নাটক নিয়ে এদেশে আসলে তাদের একপলক দেখার লোভে নব্য দর্শকদের দাপটে থিয়েটারের নিয়মিত দর্শকরাই ছিটকে পড়েন, টিকেট না পেয়ে নাটক উপভোগ থেকে বঞ্চিত হন। এই সুযোগটি আয়োজকরাও বেশ কাজে লাগাতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পত্র-পত্রিকায় সাংবাদিকদের প্রচারণায় যেখানে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়েন, সেখানে- সাংবাদিকদের জন্য বরাদ্দ থাকা আসনও মুনাফালাভের চিন্তায় আয়োজকরা বিক্রিকরে দেন। ভিনদেশমত্ত বড়লোকী স্বভাবের ওইসব দর্শক বছরে ২/৪দিন নাটকপাড়ায় লেজ নাড়েন।

 

অথচ, আমাদের দেশীয় অনেক ভালোমানের নাটক ও শিল্পকর্মই আশানরুপ দর্শক পায়না। হিন্দিসিরিয়ালে আসক্ত ওইসব হুজুগেরা এসবে নাক ছিটকান। এমনটি শুধু গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবেই নয়, এর আগে ঢলি বসু, রতন থিয়াম, কানহাইলাল এমনকি আকরাম খান ও গ্লোব থিয়েটার যখন পারফর্মেন্স নিয়ে বাংলাদেশে আসে তখনও একই চিত্রের দেখা মেলে। বিষয়টি কোন ভিনদেশী শিল্পী বা শিল্পকর্মের প্রতি বিদ্বেষ থেকে নয়, সবার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি- নিজস্ব জাতীসত্ত্বা, শিল্পসত্ত্বাকে হৃদংকনের দায় সবারই রয়েছে, এই বোধ থেকেই নিজেদের শিল্প-সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া সবার উচিত নয়কি? অথচ, চলতি উৎসবে এখন পর্যন্ত সৌমিত্রবাবুর সংস্তব’র দুটি নাটক ব্যতিত অন্যকোন নাটকই দর্শকে হলপূর্ণতা পায়নি।

 

বিষয়টি অবশ্যই পরিতাপের। আসরের তৃতীয় দিন মূলহলে চট্টগ্রামের উত্তরাধিকারের নাটক ‘সাম্পান নাইয়া’ দেখে বের হতে হতে একজন দর্শক প্রশ্নবোধক মন্তব্য করে বসেন- ‘এতো চমৎকার একটি দেশজ নাটকে মিলনায়তনের অর্ধেক আসনও পুরেনি, গত দু’দিনের হাইব্রিড দর্শকরা কোথায়?’।
বর্ণীল আয়োজনের এ আসরে নান্দনিক সাজ-সজ্জায় ছেড়ে গেছে জাতীয় নাট্যশালাচত্বর। শুরু থেকেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল যেমনি উদ্দীপনা একই রঙ্গে মেতে ওঠে এদেশের সংবাদমাধ্যমও। সেই উষ্ণতায় যেন সৌমিত্রময় হয়ে ওঠে চলমান ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসব’।

 

আয়োজনে এতো বর্ণীল ও বৈচিত্রতা থাকলেও যেন সৌমিত্র জয়োধ্বনীতে ম্লাণ হয়ে গেছে উৎসবটি। তবুও, সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রাণের জাগরণে মেতেছে ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। শুধু তাই নয়, এটি হয়ে উঠেছে দুই বাংলার সম্প্রীতির সেতুবন্ধনে যোগসূত্র। যা দু’দেশের কাঁটাতারের সিমানা ছাড়িয়ে ভেসে চলেছে অনবদ্য হৃদস্রোতে। এই একাত্মার অটুট বন্ধন এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নজয়ের সিমা ছাড়িয়ে। উৎসবে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গনের উন্মুক্ত মঞ্চে চলছে নৃত্য, আবৃত্তি, গণসঙ্গীত ও পথনাটক। জাতীয় নাট্যশালা’র মূল মিলনায়তন এবং পরিক্ষণ হলে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় প্রদর্শিত হচ্ছে নির্বাচিত মঞ্চনাটক। ভারত ও বাংলাদেশের সর্বমোট ৫৩টি নাট্য ও সাংস্কৃতিক দল অংশগ্রহণ করছে এবারের আয়োজনে। বর্ণাঢ্য আবহে আন্তর্জাতিক এই আসরের পর্দা নামবে ১২ সেপ্টেম্বর।