বিশেষ সংবাদ:

ভাবসাধনের অনবদ্য রসায়ন ‘মহাজনের নাও’

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের গানে মুগ্ধ হয়নি, আবেগে হৃদ্ধ হয়নি, গভীর অনুরণে মন-দৌলায়নি এই বঙ্গে এমনজনা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর।

 

মনের দুঃখ কার কাছে জানাই, মাটির সারিন্দা তোর বাজায় কোন জন, ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে ময়ূরপঙ্খী নাও, বসন্ত বাতাসে সই গো, আমি কুলহারা কলঙ্কিনী, আইলায় নারে আইলায় নারে, গবীবের কী মান-অপমান দুনিয়ায়... এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান অকপটে বাঙালির মন রাঙ্গায় আজও।

 

করিমের সাধনা ছিল নিজেকে জানা এবং সৃষ্টিকর্তার রহস্য উদ্ঘাটন করা। তাইতো দেহতত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়েই তার সঙ্গীতসাধন। লিখেছেন, গেয়েছেন হৃদয়ছোঁয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গান।

 

১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলায় এমনি যাদুমাখা গানে আফ্লুত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন হলপূর্ণ দর্শকেরা। সঙ্গীতাঙ্গনের অনন্য এ ব্যক্তিত্বের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এদিন সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার পরিক্ষণ থিয়েটার হল লবিতে বর্ণাঢ্য স্বরণানুষ্ঠান শেষে পরিক্ষণ হলে মঞ্চস্থ হয় সুবচন নাট্যসংসদের আলোচিত নাটক ‘মহাজনের নাও’। বাউল করিমের জীবনের জটিলতা, সংকট ও ভাবতত্ত্ব উত্তরণের প্রয়াসই এ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য।

 

নাটকের পূর্বক্ষণে অন্ধকার মঞ্চে পিনপতনের শব্দটুকু নেই। আলো জ্বলতেই মায়ামূখর ‘বিসমিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ’ কন্ঠচয়নে নাটকের সূচনা হয়। ‘মহাজনের নাও’ অথবা করিমের ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ময়ূরপঙ্খি নাও’ জগৎসীমা পেরিয়ে যেন এগিয়ে চলে মহানপ্রভুর ব্যকুল সন্ধানে।

 

পুরো নাটক জুড়েই গান ও ছন্দময় কথামালার অপার সমাহার। যেখানে উঠে আসে আব্দুল করিমের বাস্তবিক জীবনাংকের ইতিবৃত্ত। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে কৃষক পরিবারে অভাব অনটনের মাঝে বেড়ে ওঠলেও সঙ্গীতের মায়া তিনি ছাড়তে পারেননি। দিনে রাখালের কাজ করে রাতে পড়াশুনা শিখতে যেতেন নৈশ-বিদ্যালয়ে। তিনি আধ্যাত্মিকতা, দেহতত্ত্ব, প্রেম-বিরহ, ব্যকূলতার সত্ত্বা খুঁড়ে গান বুনেছেন, গভীর মমত্বে গেয়েছেনও।

 

নাটকে দেখা যায়, দাদার কাছ থেকে দেহতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব সহ নানা বিষয়ে তালিম নেন করিম। তখনই কিশোর করিমের মনে নানা কৌতুহল ও জিজ্ঞাসা বাসা বাঁধে। ফলে গানে গানে মানুষের দুঃখে করিম কাঁদে, আফ্লুত হয়, তার কণ্ঠে উঠে আসে হাওর প্রদেশের গান, আসে ভাটির টান; আসে মানবিকতা, সাম্য, সংকট, ত্যগ, মহিমার সমিকরণ। গান-বাজনা করে বলে বাউল করিমকে ভাটি গ্রাম উজানধরের মসজিদের ইমাম গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিতে চান। এদিকে আকবর, রুহী, বনেশসহ ভাটি অঞ্চলের বাউলের দল করিমের দলে এসে ভিড়ে। সবাই মুর্শিদ মেনে করিমের শিষ্য হতে চায়। এমনি পরিক্রমায় তার শিষ্য সুনন্দ’র মৃত্যু হয়। তার কিছুদিন পরেই মারা যান আকবর। সুনন্দ’র মতো আকবরের জানাজাও পড়াতে যথারীতি ইমাম সাহেব নারাজ। ইমাম সাহেবের মন্তব্য- ধলবাসী আপনারা সকলে শোনেন এ বাড়িতে খালি গানবাজনা হয়, আল্লাহর নাম কেউ মুখে আনেনা; নামাজ রোজায় আমি দেখি নাই তারে; এখন জানাজা পড়াই কী করে? এই দ্বন্দ্ব অবশ্য শেষ পর্যন্ত থাকেনি।


আধ্যাত্মিকতাও  দেহতত্ত্বের পাশাপাশি বিদগ্ধ বাউলসাধক করিমের ভাবনাচিত্ত্ব ছিল স্বদেশপ্রেম, মাটি-মানুষ আর বৈষম্যহীনতা। তার লেখা সকল গানে সেই দৃষ্টান্তই গণমানুষের অন্তরীক্ষে আলোড়িত করেছে, রোববার ছুঁয়ে গেছে মিলনায়তন টইটম্বুর দর্শকদেরও হৃদসীমা। করিম তার গানে নৌকাকে অনেক বেশি ব্যবহার করেছিলেন। নিজেকে ভেবেছিলেন কোনো এক মহাজনের কাছ থেকে ধার পাওয়া এক নৌকা। যে নৌকার মালিক তিনি নন, শুধু সঠিকভাবে চালিয়ে কোনো এক ‘সোনার গাঁও’-এ পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব তার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার নাও কোন গাঁয়ে ভিড়েছে, এটা শুধু মহাজনই জানেন। সে ভাবনাই স্থান পেয়েছে নাটকে। সমন্নিত শিল্পালিঙ্গনের ¯্রােতে যে নাওয়ে রঙ্গিন পাল উড়ায় সুবচন নাট্যসংসদের প্রাণবন্ত কর্মীরা। মূলত, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবনদর্শন ও তার জীবনকাব্য উপজীব্য করে গড়ে উঠেছে নাটকের গল্প। তার বালকবেলা থেকে শুরু করে মৃত্যু পরবর্তী জানাজা পর্যন্ত সময়টি অঙ্কিত হয়েছে এতে।


কথার কারুকার শাকুর মজিদ রচিত দর্শক নন্দিত এ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রতিশ্রুতিশীল নাট্যপ্রতিভা সুদীপ চক্রবর্তী। নাট্যপ্রয়োগে প্রাণবন্ত অভিব্যক্তির সাথে ছন্দময় সংলাপেও ছিল হৃদয়াচ্ছন্ন গভীরতা। যা মুগ্ধ করেছে উপভোগী দর্শকদের। এতে আবদুল করীমের জীবন ও দর্শন প্রকাশিত হয়েছে গীতলভাষ্যে। একইসাথে পুঁথির ঢঙে পয়ার ছন্দ উপস্থিতির হৃদয়েও অবারিত ঢেউ বুনেছে। আহসান হাবীব নাসিমের সঙ্গীতায়নে নাটকে উপস্থাপিত গানগুলো গাওয়া হয়েছে প্রকৃত সুরেই। আধুনিকতার ছোবলে এসব গানের মূল সুর এখন নেই বললেই চলে। ঊনিশ শতকের বড় বড় আন্দোলনে সুরালোয়ে সক্রিয় ছিলেন করিম। যেজন্য দেশবরেণ্যদের প্রিয়পাত্র তিনি। কিন্তু জীবনের পরিণতিতে এসে অনাহারে- অর্ধাহারে দিনাতিপাত এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়া-সহ তার জীবনকাব্যের কোন কিছুই বাদ পড়েনি শাকুর মজিদ অঙ্কিত এ নাট্যের শিল্পমন্ডিত নাট্যসংলাপ থেকে। যার সাবলীল উপস্থাপনে স্বার্থক নাট্যসৃজনে রূপ পেয়েছে প্রাণবন্ত এই জীবনাখ্যান।

 

মাঝে মধ্যে দু-তিনটি মুখ অভিব্যক্তি ও নাট্যস্রোতের ছন্দপতন ঘটালেও বাকি চরিত্রগুলোর যথার্থ রূপায়নের জন্য অভিনেতারা সাধুবাদ পাবেন। এই মুনসিয়ানা অবশ্য নির্দেশকেরই। নারী চরিত্রটিও বর্ণীল অভিনয় শৈলীতে নাটককে অলঙ্কিত করেছেন। সেই ছন্দে দর্শকমন একাত্মার হয়ে ছুটে বেড়িয়েছে ভাটি গ্রাম উজানধরের নানা আঙ্গিনায়। মনগ্রাহী সুরের মুর্ছনায়, বর্ণীল কোরিওগ্রাফি ও সংলাপের গভীরে দৃশ্যকল্প নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমাদের নাটকে যেন যুক্ত হয়েছে নবতরমাত্রা। নাটকের পোষাকও ছিল বাউল আবেশে। প্রপস্ ও এর ব্যবহার ছিল মানানসই। নাটকটির সেট বলতে সাদামাঠা অবয়বে ছোট ছোট বেশ কিছু শীতল পাটি বিছানো মঞ্চ ছিল কয়েকটি বাক্স ও বৈঠা বেষ্টিত। যা দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে হয়ে ওঠে বহুরূপমায়।

 

বেশ কিছু দৃশ্যে আলোক প্রক্ষপনের ত্রুটি এড়িয়ে গেলে বিস্তর সময় আলোকায়ন ছিল প্রশংসনীয়। পুরো নাটকই বর্ণিত হয়েছে দেশজ পালা, উঠান গান এমনকি বাউলগীতাসরের আবহে। যা বর্ণনাত্মক অনবদ্য সংলাপকারুতে শাহ আব্দুল করিমের জীবনের মতোই সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে। সংলাপের মোহে কখনো দর্শকের মুখোমুখি হয় চলমান সমাজ ব্যবস্থার অমানবিক চিত্র, কখনোবা ধরা দেয় ধর্মের নামে অবান্তর কু-সংস্কার। সুরে সুরে এই দর্শকই আবার স্নান করে মধ্যরাতের পালাবয়ানে। যেখানে প্রতিটি দর্শক ডুবসাঁতার কাটে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির মসৃণ আবেশে।

 

নাটকটির ভাবমর্মে সকল দর্শকই অভিভূত। লেখনি আর দৃশ্যকাব্যে কোন মানুষ কিংবা ঘটনাকে এতটা জীবন্ত করে উপস্থাপন করা যায়, তার নজির স্থাপন করেছেন শাকুর মজিদ ও সুদীপ চক্রবর্তী। তাদের সাথে প্রাণান্তর চেষ্টায় জীবনছোঁয়া ‘মহাজনের নাও’ এর পাল উড়িয়েছেন সুবচনের একঝাঁক তরুণ। অনবদ্য এ নাট্যসৃজনের কল্যাণে ‘শিল্পসমৃদ্ধ নাট্যনির্মানের অনন্য স্বীকৃতি’ সুদীপ চক্রবর্তী ও সুবচন নাট্যসংসদ যে দীর্ঘ সময় বহন করবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন আহাম্মেদ গিয়াস, আসাদুল ইসলাম, লিঠু রানি ম-ল, আমিরুল ইসলাম বাবুল, আনসার আলী, সোনিয়া হাসান সুবর্ণা, ইমতিয়াজ শাওন, ইমরান হোসেন, তানভীর দিপু, সোহেল খান প্রমুখ।