বিশেষ সংবাদ:

মুক্তিযুদ্ধের নাটক অপ্রতুল : আমাদের মঞ্চাঙ্গন এখন চরম পান্ডুলিপি সংকটে

Logoআপডেট: বুধবার, ২৬ মার্চ, ২০১৪

শিহাব ফারুক
যেকোন প্রতিবাদ বা বিপ্লবই সংস্কৃতিমনা মানুষকে উজ্জীবীত করে। সত্য প্রকাশ আর সুন্দর প্রতিষ্ঠায় শিল্প-সমাজের সৌ”চার মনোভাব যেন মুক্ত পথের সন্ধান দেয়। এটি যেন শিল্পসত্ত্বার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। শিল্প-সংস্কৃতির সৃজনশীল মানুষেরা এমনি আলো ছড়ায় আপন মহিমায়। সে অর্থে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গণকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।

স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার ন্যায় মঞ্চনাটককেও দারুণভাবে প্রভাবিত করে। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু নাটক। সময়ের ঘনিষ্টতায় স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ এদেশের নাট্যাঙ্গনকে ভাবিয়ে তুলেছে নতুন মূল্যবোধে। গেল দুইশ’ বছরেরও অধীক সময়ের মঞ্চাঙ্গ স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ঠিক যতটা এগিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে।

১৯৭১ সালের পূর্বে রচিত আমাদের নাটকগুলো মহান স্বাধীনতার সংগ্রামকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তখনকার বহু নার্টকর্মী। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন- মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুু, রাইসুল ইসলাম আসাদ এবং ম.হামিদসহ রণাঙ্গনে অংশ নেওয়া বহু লড়াকু। তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের হয়ে কাজ করেছেন কলিম শরাফী, রনেশ দাস গুপ্ত, সৈয়দ হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদারসহ বহু নাট্যযোদ্ধা। কারারুদ্ধ অবস্থায় একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী নাট্যজন মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন অনবদ্য নাটক ‘কবর’।

শুধু কবরই নয় স্বাধীনতা পূর্বসময়ের প্রতিবাদমুখী বহু নাটক যুদ্ধকালীন সময়েও বাঙালীকে উৎসাহ যুগিয়েছে। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই নতুন দেশের মঞ্চে আমাদের নাটক প্রাণ পায়। বিশেষ করে মুক্তির চেতনায় বিপ্লবী কথোপকথনে নির্মিত পথনাটকও জাতীকে উদ্দীপ্ত করে। ৭১-৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে অর্ধশতাধিকের বেশী নাটক রচিত হয়। এসব নাটকে মর্মার্থক শিল্পালোয়ে পাকদের শোষণ অত্যাচারের নারকিয় চিত্র ফুটে উঠে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মমতাজউদ্দীন আহমেদ রচিত ‘এবারের সংগ্রাম’ ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ও ‘বর্ণচোর’। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মঞ্চে আসা আলোচিত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- এসএম সোলায়মানের ‘ইঙ্গিত’, জিয়া হায়দারের ‘সাদা গোলাপে আগুন’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘নিঃশব্দ যাত্রা’, ‘নরকে লাল গোলাপ’, নিলীমা ইব্রাহীমের ‘যে অরন্যে আলো নেই’, নুরুল আম্বিয়ার ‘কুমারখালির চর’, কল্যাণ মিত্রের ‘জল্ল¬াদের দরবার’,
মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সফল ও আলোচিত নাটক লিখেছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। তার কাব্য নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ দেশেব্যাপী আলোচনার ঝড় তোলে। এছাড়াও তিনি লিখেছেন ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ এবং এখানে এখন। গেল চারদশকে মুক্তিযুদ্ধের যেসব নাটক আমাদের নাট্যভান্ডারকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে তার মধ্যে অন্যতম- মুনতাসির ফ্যান্টাসি, বহিপীর, প্রতিদিন একদিন, হে জনতা আরেকবার, নেমেসিস, রোলার, নিহত এলএমজি, এখনও দুঃসময়, একবার ধরা দাও, ফেরারি নিশান, খেকশিয়াল, খেলা, ঘুমের মানুষ, আগুনমুখা, এবং ক্ষুদিরামের দেশে, পশ্চিমের সিঁড়ি, জয়জয়ন্তী, ওরা কদমআলী, সেইসব দিনগুলো, হায়েনা, কাত্তরের পালা, ঘুম নেই, সময়ের প্রয়োজনে, কোর্ট মার্শাল, ‘কথা ৭১’র মতো অন্যন্য সৃষ্টি। সম্প্রতিক সময়ে ‘লালজমিন’, ‘হনন’, ‘মুখোশ’, ‘টার্গেট প্লাটুন’, ‘মুক্তি মুক্তি’, ‘একাত্তরের পালা’, ‘মুক্তি’সহ নতুন আরও বেশ কিছু নাটক জাতীকে উজ্জীবীত করেছে। স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা ৪০ চার দশককে স্বরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শতাধিক নাটক নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে সর্ববৃহৎ ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয় নাট্যোৎসব’এর মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমগ্র দেশ যেন মেতে উঠে নাটকের আনন্দযজ্ঞে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে স্বদেশপ্রেমের অনেকগুলো মঞ্চ নাটক এবং পথনাটকই রচিত হয়েছে। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে তা অপ্রতুল। তাছাড়া এসব নাটকের বেশীরভাগই আলোর মুখ দেখেনি। একই সাথে বানিজ্যিক গেঁড়াকলে যেন আমাদের মেধাগুলো লেপটে পড়ছে, মঞ্চের পান্ডুলিপির চাইতে আমাদের বেশীরভাগ নাট্যকার জীবন-যাত্রার মাত্রা ঠিক রাখতে টিভিমিডিয়ার কাজে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন।

যা মোটেও ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না। এতে করে আমাদের মঞ্চাঙ্গন এখন চরম পান্ডুলিপি সংকটে ভূগছে। এর থেকে পরিত্রানের জন্য সংশ্লিষ্টদেরই এগিয়ে আসতে হবে। একই সাথে নাটকের অবিভাবক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে যথার্থ উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।