বিশেষ সংবাদ:

মুক্তিযুদ্ধের পান্ডুলিপি সংকটে মঞ্চাঙ্গন

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
মহান মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য ফসল আমাদের মঞ্চনাটক। ৭১-এর পূর্বে এদেশে মঞ্চায়িত প্রায় সব নাটকই ছিল সামাজিক ও সচেতনতামূলক।

 

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মঞ্চনাটক প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে। এটি আমাদের সংস্কৃতির অনেক বড় অর্জন।

 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নব-নাট্যান্দেলনের পথ ধরে আমাদের নাটক প্রবাহিত হয় নতুন উদ্যমতায়। স্বাধীনতা পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিপ্লবীধারার নাটকের পাশাপাশি আমাদের নাট্যাঙ্গন সামাজিক ও ঘটনাভিত্তিক, বাস্তবধর্মী, রোমান্টিক এমনকি কমেডী ধাচের নাট্যচর্চায় মনোনিবেশ করে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ৭০-৮০ বা ৯০য়ের দশকে আমরা মুক্তিযুদ্ধনির্ভর শিল্পসমৃদ্ধ ও হৃদস্পর্শক যেসব প্রযোজনা পেয়েছি পরবর্তী সময়ে সেই-ধারা বজায় থাকেনি।

 

ফলশ্রুতিতে চলছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্পসমৃদ্ধ পান্ডুলিপি সংকট। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ড.ইনামুল হক বলেন, ‘আসলে তখনকার সময় একটা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ, সদ্য ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক নানা ঘটনাচিত্র, অর্থাৎ স্ব-চক্ষে দেখা বিষয়গুলোকে নাট্যকাররা নাটকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু সেটি পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থাকেনি।

 

পাশাপাশি একটি বিষয়ে বলতে হয় যে, তখনকার নাটক কিংবা পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের নাটক- কোথাও গভীরভাবে মুক্তিযুদ্ধের পুর্ণাঙ্গ বিষয়াদি অর্থাৎ এদেশের মানুষের আত্মসামাজিক অবস্থা বা মানবিক-মূল্যবোধের বিষয়গুলো জোরালোভাবে নাটকে আসেনি। যেমন পাক দোষররা প্রথমত, বাঙালীদের ধরে বলতো- তুমকো হিন্দু হ্যায়, কাফের হ্যায়, মুজিবকা আদমি হ্যায়, জয় বাংলা হ্যায়... এমনি একের পর এক প্রসঙ্গ ধরে তল্লাশি চালাতো। এমনি বিষয় ধরে ধরে নাটক রচিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। কিন্তু চেতনার যে বিস্তৃত-রুপায়ন তা নাটকে সেভাবে আসেনি। একইসাথে কি জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সে বিষয়গুলো পয়েন্ট ধরে-ধরে আসেনি।’ তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘আসলে মুক্তিযুদ্ধতো আমাদের স্ব-চক্ষে দেখা। কিন্তু এখনকার প্রজন্মতো এবিষয়ে শুনে কিংবা পড়ে লিখছে।

 

এক্ষেত্রে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের নাটকতো এখনও হচ্ছে কিন্তু উন্নতমানের নাটক পাওয়ার জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। সময়ের সমীকরণে নতুন প্রজন্ম যেভাবে টিভি মিডিয়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে এতেকরে আমাদের মঞ্চে নাট্যকার বা নাটকের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তারপরও আমি মোটেও হতাশ নই।’ মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু সার্থক নাটকের নাট্যকার মান্নান হিরা বলেন, ‘এটি সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধনির্ভর নাটক বেশি হয়েছে।

 

এখনও যে হচ্ছে হচ্ছেনা তাও নয়। যুদ্ধের পর-স্বাধীনতার পর এমন কিছু ঐতিহাসিক মূহুর্ত বাঙালী অতিক্রম করেছে সেসব বিষয় নিয়েও অনেক নাটক লিখতে হয়েছে- মঞ্চে এবং পথে। যেমনি স্বৈরাচার বিরোধী, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধ ও  মানবতা বিরোধী আন্দেলনে শামিল হয়ে অনেক হয়েছে। সেটি দেশের স্বার্থে-আন্দোলনের স্বার্থে। সে কারণে হয়তো পরবর্তী সময়ে- পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, জয়জয়ন্তী, পশ্চিমের সিঁড়ি, ফেরারী নিশান, ক্ষুদিরামের দেশে, সুবচন নির্বাসনে’র মতো নাটক আমরা সেভাবে পাইনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং এর চেতনাটা সব সময় কম-বেশী আমাদের নাটকে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ এমন একটি পটভূমি বা ইতিহাস যা বহন করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি এগিয়ে যাবে।’

 

একই মত প্রকাশ করেছেন নাট্যজন ফাল্গুনী হামিদ, রবিউল আলম এবং মাইন উদ্দিন পাঠান। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট যাত্রানট মিলন কান্তি দে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের মধ্যে যে দায়বোধ ছিল সময়ের পরিক্রমায় সে অনুভূতিতে ছেদ পড়ে। বিশেষ করে এ সময়টায় নাট্যকর্মীদের একাংশের বানিজ্যিক মনোভাব, নতুনদের মধ্যে তেমন ভালো নাট্যকার গড়ে না ওঠা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অবিভাবক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো যথার্থ পৃষ্ঠপোষকতা বা উদ্যোগ না নেওয়া। এমনকি নাটকসংশ্লিষ্টরা টিভি চ্যানেলমুখি হওয়ার কারণেও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাঙ্খিত-নাটক থেকে জাতি বঞ্চিত হয়েছে। যাত্রাঙ্গনে আশাব্যজ্ঞক না হলেও পনেরটির মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পালা রয়েছে।

 

যার মধ্যে- নদীর নাম মধুমতি, সুন্দর বনের জোড়া বাঘ এবং এই দেশ এই মাটি উল্লেখযোগ্য।’ এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন তারুণদীপ্ত নাট্যপ্রতিভা অভিমত জানিয়েছেন। তারমধ্যে মোমেনা চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আসলে খুবই দুঃখজনক যে, গত দু-তিন দশকে শুধু মঞ্চেই নয় টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রেও আমরা হৃদয়ে দাগ কাটার মতো প্রযোজনা খুব একটা পাইনি। আমি আমাদের রেপাটরী দলের জন্য মুক্তিযুদ্ধনির্ভর আরেকটি বৈচিত্রময় নাটক করার মনোভাব পোষন করেছি। যেজন্য দেখার চেষ্টা করেছি যে, কারা মুক্তিযুদ্ধের ভালো নাটক করেছে। আমি খুব একটা খুঁজে পাইনি, নিরাশ হয়েছি।