বিশেষ সংবাদ:

মঞ্চাঙ্গনে একুশের নাটকের সংকট

Logoআপডেট: বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

ফারুক হোসেন শিহাব
১৯৫২ সালে মহান ভাষার বিপ্লব থেকেই বাঙালীর সকল আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। সমগ্র জাতিকে এভাবে একাত্ম হতে এর আগে কেউ দেখেনি।

 

এমনকি বলা হয়ে থাকে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন এমনকি ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ৫২’র ভাষা আন্দোলনেরই ফসল।

 

সেই বিপ্লবী চেতনাই আজো আমাদের প্রেরণা যোগায়, বুক ফুলিয়ে বাঁচতে শেখায়। কেননা, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ভাষার জন্য এভাবে কোন জাতীকেই প্রাণ বলি দিতে হয়নি। বিরল এই আন্দোলনের অকুভয় সৈনিক তথা বাংলার সেসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রাণ বিসর্জনেই আমরা পেয়েছিলাম প্রাণের ভাষা ‘বাংলা’। যাদের ত্যাগের কল্যাণে বাংলা পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার গৌরবময় স্বীকৃতি।

 

তাই প্রতি বছর ৫২’র ভাষা আন্দোলনে আত্মবলিদানকারী অমর ভাষাশহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অর্পনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে পুরো ফেব্রুয়ারী জুড়েই আয়োজন করা হয় বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা। প্রতি বছরের ন্যায় এবার ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে সমগ্র জাতি পালন করছে ‘মহান ভাষা দিবস’। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশের সংস্কৃতির অন্যতম সফল মাধ্যম মঞ্চাঙ্গনে নেই একুশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন আয়োজন। বিশেষ করে ভাষা বা একুশের চেতনা ভিত্তিক বর্ণাঢ্য কোন আয়োজন না থাকায়  মঞ্চাঙ্গনের দর্শক শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে এ নিয়ে প্রতিবছরই থাকে নানা উৎকন্ঠা। অথচ, প্রকৃত পক্ষে ৫২’ ভাষা আন্দোলনের প্রতিরোধ ছিল বাঙালীর অস্তিত্ব আদায়ে অব্যাক্ত প্রতিবাদের প্রথম বিপ্লবী বহিঃপ্রকাশ।

 

যে আন্দোলন বাঙালীর সকল সাহস, শক্তি ও প্রেরণার উৎস। মহান স্বাধীনতার মূল বীজ বপন করা হয়েছিল ৫২’ ভাষা আন্দোলনে, কিন্তু এই মহান অর্জনকে নিয়ে আমাদের মঞ্চাঙ্গনে নেই তেমন কোন শিল্পসৃষ্টি, নেই উল্লেখযোগ্য নাট্যভান্ডার। এই দ্বায় কার? ভাষা আন্দোলন পরবর্তী অদ্যাবদি মর্মময় এই প্রেক্ষাপটে পাঁচ-সাতটি মঞ্চ নাটক রচিত হলেও শুধুমাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরির আলোচিত নাটক ‘কবর’ সংস্কৃতিক অঙ্গনে দারুন ভাবে আলো ফেলে। বাকী প্রযোজনাগুলোর মধ্যে দু-তিনটি সাময়িকভাবে দর্শক মনকে পিড়ীত করলেও তা স্থায়ী হয়নি। এর মধ্যে কাইজার আহমেদের ‘বায়ান্নের শকুর’, মমতাজ উদ্দীন আহমেদের ‘বর্ণচোরা’ উল্লেখযোগ্য। সে অর্থে ভাষা আন্দোলনের একমাত্র সফল নাটক ধরা হয়ে থাকে শহীদ মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ কেই। কেননা, শুধুমাত্র ঢাকার দলই নয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই নাটকের রেশ বয়ে চলেছে অবিরাম।

 

ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালী অস্তিত্বের প্রধান চেতনাত্মক অধ্যায় হলেও অজ্ঞাত কারণে আমাদের নাট্যকাররা থিয়েটারে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আশানরুপ নাটক রচনা করতে সক্ষম হননি। ৫-৭টি পথনাটক ও কিছু মঞ্চনাটকে মুক্তিযুদ্ধের ধারা বর্ণনায় ৫২’র ভাষা আন্দোলনের একটু-আধটু রেশ থাকলেও হৃদয়গ্রাহী এ আন্দোলনের উপর পূর্ণাঙ্গভাবে সম্মান সংখ্যক পান্ডুলিপি রচিত হয়নি। এটি জাতীয় জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যদিও টেলিভিশন মাধ্যম বিষয়টিকে উৎরিয়ে গেছে। কেননা, টিভি মিডিয়ায় এরই মধ্যে মহান ভাষা আন্দোলন নিয়ে বহু নাটক নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় ভাষার লড়াই নিয়ে আশাব্যজ্ঞক মঞ্চ প্রযোজনা না হওয়ায় নাট্যাঙ্গনকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রুটি-রুজির দোহাইয়ের সাথে সাথে ব্যাবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বেশিরভাগ নাট্যকারদেরই কব্জা করে ফেলেছে -এমনটাই ধারণা থিয়েটার সংশ্লিষ্টদের।

 

এজন্য আমাদের সংস্কৃতি অনুরাগীরা নাট্যকারসহ দায়িত্বশীলদের উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। একই সাথে মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে এ আন্দোলনকে ঘিরে নাট্যকাররা পর্যাপ্ত পান্ডুলিপি রচনা করবেন বলে আশা করছেন। এরই মধ্য দিয়ে ভাষার নাটকের সংকট দূর করার পাশাপাশি একুশের প্রসঙ্গিকতায় নাট্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতে দেশের নাট্যকার তথা থিয়েটার সংশ্লিষ্টদের প্রতি নাট্যপ্রেমী দর্শক-শুভাকাঙ্খিদের অনবদ্য প্রত্যাশা।