বিশেষ সংবাদ:

‘ক্ষমা করো হযরত’

Logoআপডেট: সোমবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সালেহ উদ্দিন ভূঁইয়া
কবিতাটি লেখা হয়েছে সম্ভবত গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে কিংবা তারও আগে। কিন্তু কবিরা যে শুধু পোয়েট নন, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাও, নজরুলের শুধু এই কবিতায় নয়, বহু কবিতায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

‘ক্ষমা করো হজরত’ কবিতাটি পড়লে মনে হয়, কবি যেন প্রায় শতবর্ষ আগেই আমাদের বর্তমান অবস্থা স্বচক্ষে দেখে কবিতাটি বর্তমান বাংলাদেশে বসে নজরুল এটি লিখেছেন।

 

খবর পাই যে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে জঙ্গিদের হামলায় অর্ধশতাধিক নিরীহ নর-নারী নিহত ও তারও বেশি লোক আহত হয়েছে। পবিত্র ইসলামের নামে দেশে দেশে এই বর্বর হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে একদল তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলছে এই নির্মম হত্যাকান্ড। মুসলিম বিশ্বে মুসলমানের রক্তে একদল মুসলমানের হাত রঞ্জিত। কারবালায়ও কি এত মুসলমানের রক্তে মুসলমানের হাত রঞ্জিত হয়েছিল? প্রায় নিয়ত এই হত্যাকান্ডের খবর পড়ি আর মনে মনে নজরুলের কবিতাটি আবৃত্তি করি।

 

‘ক্ষমা করো হজরত
ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ তোমার দেখানো পথ।
‘তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি,
তলওয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী,
মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা সার করিয়াছি ধর্মান্ধতা
বেহেশত হতে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত।
ক্ষমা করো হজরত।’

 

আমার মনে হয়, এবারের পবিত্র ঈদে সারা বিশ্বের মুসলমানেরই উৎসবের পরিবর্তে ঈদের মাঠে জমায়েত হয়ে ঐক্যবদ্ধ কন্ঠে ইসলামের বাণীবাহকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। একদা ইসলাম সারা পৃথিবীতে যে শান্তি, সাম্য, উদারতার জোয়ার সৃষ্টি করেছিল, আমরাই তাকে আজ বর্বর ধর্মান্ধতায় পরিণত করেছি। ইসলাম বলেছে, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ সেখানে আমরা মুসলমানরা শিয়া, সুন্নি, আহমদিয়া ইত্যাদি ভাগে নিজেদের বিভক্ত করে নিজেরা নিজেদের ধ্বংস সাধনে উম্মত্ততার পরিচয় দিচ্ছি। গোঁড়ামি ও কুসংস্কার তাদের মধ্যে কাজ করে বলে তা থেকে ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষের জন্ম হয়। এই ঘৃণা ও বিদ্বেষের মধ্যে নিহিত থাকে ফ্যাসিবাদের বীজ।


প্রথম মহাযুদ্ধের পর জার্মানিতে নাৎসিবাদের জন্ম ইহুদি ধর্ম ও ইহুদি জাতিকে চরম ঘৃণা করার মধ্য দিয়ে। ভ্যাটিকানের পোপের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল নাৎসিরা। নাৎসি নায়ক হিটলারের মাইন কাম্ফ বইয়ের মূল বক্তব্য-জার্মানরাই পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠ আর্যজাতি, যাদের অপর জাতিগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্মগত অধিকার রয়েছে। ইহুদিরা বা অন্য ধর্মের মানুষরা মনুষ্য পদবাচ্য নয়। এই ফ্যাসিবাদের ধ্বংসলীলা আমরা গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রত্যক্ষ করেছি। ফ্যাসিবাদের জন্ম পশ্চিমা ক্যাপিটালিজমের হাতে। কমিউনিজমকে রোখার জন্য ইউরোপে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়া হয়েছিল। পলিটিক্যাল ইসলাম বা ইসলামী জঙ্গিবাদের জন্ম পশ্চিমা ক্যাপিটালিজমের হাতে।

 

একই উদ্দেশে, কমিউনিজমকে রোখা এবং গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের আধিপত্য রক্ষা। একসময় হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠনে যেমন আমেরিকার ধনকুবেররা অর্থ জুগিয়েছে, তেমনি বর্তমান যুগে মধ্যপ্রাচ্যে আল-কায়েদা, তালেবান, আইএস প্রভৃতি জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরিতে সব ধরনের সহায়তা জুগিয়েছে আমেরিকা। বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের মতো একটি ফ্যাসিবাদী দলকে ‘মডারেট ইসলামী দল’বলে সার্টিফিকেট দিয়েছিল আমেরিকাই। ইউরোপে নিজেদের সৃষ্ট ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্বকে লড়তে হয়েছিল, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে ও অন্যান্য মুসলিম দেশে মাথা তুলেছে যে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদ, তার বিরুদ্ধেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নেমে পশ্চিমা শক্তি তাদের মরণাস্ত্র তৈরির বাজার সম্প্রসারিত করছে এবং বিশ্বে এক মহাধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করেছে।


ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাই ধন্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সমরবাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ। এই জঙ্গিবাদেরও জন্ম ঘৃণা, ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ থেকে। প্রকৃত ইসলামী খিলাফত নয়। প্রকৃত খিলাফতের আদর্শ ও নীতির সঙ্গে তারা পরিচিত নয়। ধর্মান্ধতার আফিম তাদের খাওয়ানো হয়েছে। তার নেশায় তারা বুঁদ। এই ধর্মান্ধতার আফিম তারুণ্যের কী ক্ষতি করতে পারে তা প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত করা হচ্ছে। গুলশানে অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহতদের বাইরে আরো কত তরুণ ওই সর্বনাশা পথে পা বাড়িয়েছে, কে জানে! গত ঈদুল ফিতরে কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া ঈদের জমাতের ভিতরে হামলা চালাতে পারলে বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্য হত্যাকান্ডে ঈদের জমাতের প্রায় আড়াই লক্ষ মুসল্লির মধ্যে লক্ষাধিক মুসল্লি নিহত হতো। ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদের ভয়াল থাবায় আক্রান্ত আজ বাংলাদেশ। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই জঙ্গিগোষ্ঠীর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।

 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পলিটিক্যাল ইসলামের অপর নাম রাজাকার, আলবদর, আলশামস যারা গনিমতের মাল বলে বাড়ি ঘরে লুট পাট করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে কাফের বলে ৩০ লক্ষ মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান বাঙ্গালীদের হত্যা করে ২ লক্ষ মা-বোনকে ইজ্জ্বত হরণ করে কেড়ে নিয়ে ১ কোটি বাঙ্গালী ভারতে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমান সময়ে পলিটিক্যাল ইসলামের অপর নাম জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ এর মাধ্যমে মানুষ হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। পলিটিক্যাল ইসলাম বা ফ্যাসিবাদী ইসলাম শুধু মানবতার শত্রু নয়, প্রকৃত ইসলামেরও শত্রু। ইসলামকে সারা বিশ্বে কলঙ্কিত করছে এই বর্বর ঘাতকের দল। এর বিরুদ্ধে প্রকৃত মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। এবারের ঈদে সেই ঐক্যের ডাক দেওয়া হোক। মহানবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর আদর্শে ফিরে যাওয়ার শপথ নেওয়া হোক। এই আন্দোলনে প্রকৃত আলেমরা সামনে এসে দাঁড়ান।


লেখক: সাবেক জি.এস ১৯৭২ সাল লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ ছাত্রসংসদ ও সভাপতি- জাসদ, লক্ষ্মীপুর জেলা।