বিশেষ সংবাদ:

জেনেসিস থিয়েটারের ২৬ বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

Logoআপডেট: সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

এম আর মাহবুব

বাংলাদেশের বিকল্পধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের গর্বিত অংশীদার জেনেসিস থিয়েটার।

 

‘চলচ্চিত্র হোক জীবন প্রেম, দ্রোহ, বিশ^ মানবতার সপক্ষে’ এই স্লোগানকে ধারন করে ১৯৯০ সালে বিশিষ্ট নাট্যজন নূর হোসেন রানার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জেনেসিস থিয়েটার। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এই সংগঠনের সাথে আরও যারা জড়িত ছিলেন তারা হলেন, সাদুল্লাহ আল মাসুদ, এস এম মহসিন সাকী, নাসিম শেখ, মাহবুবুজ্জামান প্রমূখ। জেনেসিস এর প্রথম পরিবেশনা ছিল ১৬ মি.মি ক্যামেরায় নির্মিত সাদুল্লাহ আল মাসুদের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সাদাকালো চলচ্চিত্র ‘কালোচিল’।

 

জেনেসিস এর পরিবেশনায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর বিখ্যাত কবিতা অবলম্বনে প্রথম মঞ্চ নাটক ‘লিচুচোর’ ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণের পর জেনেসিস আয়োজন করেছিল নাট্য বিষয়ক কর্মশালা এবং প্রশিক্ষন কর্মসূচি। বিশেষ করে শিশু কিশোরদের দিয়ে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। কারণ জেনেসিস মনে করে শিশু কিশোরাই জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। অথচ সাহিত্য -সংস্কৃতি ও নাট্যর্চচার অভাবে সঠিক ভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। শিশুদের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি র্চচার বীজ বপনের মানসিকতা নিয়ে মঞ্চে বড়দের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের নিয়ে কাজ করতে শুরু করে জেনেসিস।

 

বাংলাশে শিশু একাডেমী ও পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশনে অর্ন্তভূক্তির পর জেনেসিস মনযোগ দেয় ছোটদের সাংস্কৃতিক বিষয়াদি ও নাট্যকর্মশালার মাধ্যমে মঞ্চ নাটক প্রযোজনার প্রতি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী আব্বাস উদ্দিন, কবি জসিম উদ্দিন প্রমূখ জাতীয় ব্যাক্তিত্বদের স্মরণে উদযাপন করে ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠানাদি । তারই ধারাবাহিকতায় জেনেসিস থিয়েটার ইতিমধ্যে নজরুলের কবিতা অবলম্বনে “লিচু চোর ” “খুকি ও কাঠ বিড়ালী”, “ তোতনের ই”েছ” ও “বেকার অমানিশা” “জুম্মন কসাই” “সূর্যোদয়ের আগে” (মঞ্চ ও শ্রুতি) “অবসর” “বর্ণমালা” “একজন আমেনা” “তামার বাটি” এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বৈচিত্র্যময় জীবন কর্ম নিয়ে নাটক “দুরন্ত নজরুল” ও “দামাল ছেলে নজরুল” নাটকগুলো মঞ্চস্থ’ করে আসছে।

 

এদের মধ্যে জেনেসিস থিয়েটার “দামাল ছেলে নজরুল” নাটকটি ২০ম মঞ্চায়ন সম্পন্ন করেছে। ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাটক বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। জেনেসিস এর যে সকল নাটক বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে সেগুলো হলো: দামাল ছেলে নজরুল, একজন আমেনা, গায়েন নজরুল, যুদ্ধে যাব মা, তুতুনের ই”েছ, লিচু চোর , বায়ান্ন’র উত্তরসূরী, বেকার অমানিষা ইত্যাদি। জেনেসিস থিয়েটার মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বিশ^াসী একটি সৃজনশীল ও প্রগতিশীল নাট্য সংগঠন। বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে সাধারন মানুষের কাছে নিয়ে যেতে তারা বদ্ধ পরিকর। জীবনধর্মী ও মননশীল নাট্যচর্চা ও নাটক নির্মাণে ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

 

গত ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলো জেনেসিস থিয়েটারের ২৬ তম প্রতিষ্ঠ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ষ্টুডিও হল মিলায়তনে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। জেনেসিস পরিবেশিত নুর হোসেন রানা রচিত ও নিদের্শিত, মাহফুজা আক্তার প্রযোজিত নাটক গায়েন নজরুল এবং সীমান্তে ওপারে প্রদর্শনীর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ফরিদা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ছড়াকার, নাট্যকার,শিশুসংগঠক ও সাংবাদিক রফিকুল হক দাদু ভাই। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যারয়ের সংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. লিনা তাপসী খান, নাট্যজন আব্দুল আজিজ, গীতিকবি শহিদুল্লাহ ফরাজী, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এর সম্পাদক(অর্থ) মীর জাহিদ হাসান, সম্পাদক(দপ্তর) খোরশেদুল আলম, নাট্যজন অধ্যাপক লুৎফুল হাসান বাবু, গবেষক, লেখক এম আর মাহবুব ও ড. এম এ মুক্তাদীর । অনুষ্ঠানে লেখক ও সংগঠক শেখ আকরাম আলীকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

সভার প্রধান অতিথি রফিকুল হক দাদু ভাই তার বক্তব্য বলেন ‘জেনেসিস থিয়েটার এর ২৬ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এ সুন্দর আয়োজনে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। নাট্যজগতে সফলতার সাথে ২৬ বৎসর অতিক্রম করা একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এই সময়ে জেনেসিসের প্রাপ্তি ও অর্জন কোন অংশই কম নয় । নাট্যজগতে আমার বিচরন বহুকাল পূর্বে। বাংলাদেশে টেলিভিশন এ পরিবেশিত প্রথম ধারাবহিক নাটক আমার লেখা। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি জেনেসিস এর পরিবেশিত নাটকগুলো বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হবে।’ তিনি জেনেসিস থিয়েটারকে আরও দক্ষতার সাথে কাজ করার আহবান জানান। সভার অন্যান্য বক্তারাও জেনেসিস থিয়েটার এর কর্মকান্ডের প্রশংসা করেন এবং আগামীতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে অগ্রসেনানীর ভুমিকা পালন করায় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। 

 

আলোচনা সভার শেষে গোল্ডেন এরা কিডস স্কুলের ক্ষুদে বন্ধুরা সংগীত পরিবেশন করেন এবং প্রাকৃতধারা আবৃত্তি দল রিফাত আমীনের নেতৃত্বে কবিতা আবৃত্তি শুনান। সবশেষে পরিবেশিত হয় শেখ আকরাম আলীর রচনায় এবং নুর হোসেন রানার নিদের্শনায় মঞ্চ নাটক “শহীদ মিনার থেকে” এবং প্রাকৃতধারা’র পরিবেশনায় রিফাত আমীনের নির্দেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মঞ্চনাটক “বউ”। নাটক দুটিতে অভিনয় করেন রিফাত আমীন, জিহান আজাদী, জামাল হোসেন, তানভীর হোসেন, চন্দনা সরকার, বিজু মাহমুদ, ইকবাল হাসান, শান্ত, আসিফ, মুক্তার, জাতিদ, আবু তাহের, আদর ও মেধা। জেনেসিস থিয়েটারের ২৬ বৎসর র্পূতির মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানটি আনন্দসহকারে উপভোগ করেন সম্মানিত দর্শকবৃন্দ। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন কবি সৈয়দ নাজমুল আহসান ও সালমা আক্তার হিরা।


নাটক হলো সমাজের দর্পন। নাটক জীবনের কথা বলে, সমাজের অসংগতির কথা বলে । নাটক সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সুস্থ পরিবেশ তৈরী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জেনেসিস থিয়েটার এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে গণমানুষের কাছে যেতে চায়, সমাজের অংশীদার হতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব নুর হোসেন রানা বলেন, “একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় জেনেসিস থিয়েটার। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারন , বিশ^ মানবতার জয়গান,সু¯’্য বিনোদন চর্চা বিনোদনসহ এই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য ।


এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতেই আমরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে কয়েকটি নাটক নির্মান করি। নাট্য আন্দোলনে শিশু কিশোরদের সম্পৃক্ত করি এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ভাইকে ধন্যবাদ জানাই কারণ তার, উদ্যোগেই প্রথম আয়োজন করা হয় শিশু কিশোর ও যুব নাট্য উৎসব। ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি আমরা সদা সচেতন তাই ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক ও চল”িচত্র নির্মান করি। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা আরও এগিয়ে যাব, ইনশাল্লাহ্। জেনেসিস থিয়েটার বাংলাদেশের নাট্যজগতে অনন্য ভুমিকা পালন করবে; এটাই প্রত্যাশা।