বিশেষ সংবাদ:

জাতীয় নাট্যোৎসব ২০১৬: মাননীয় মন্ত্রীর প্রশ্ন অতপর আরও কিছু প্রশ্ন

Logoআপডেট: সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৬
এনামতারা সাকি
(যে কোন শিল্প কিংবা শিল্প আয়োজনের বিকাশের অন্তর্নিহিত শক্তির অন্যতম হচ্ছে- সমালোচনা। আজ যা করলাম তাতে কি ভুল বা ঘাটতি ছিল সে মূল্যায়ন যদি না হয় তাহলে আগামীর সমৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু আমরা অনেকেই সমালোচনাকে ‘ব্যাক্তিগত’ ভাবে নিয়ে সমালোচনাকারিকে ব্যাক্তিগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করি। এই লেখার লেখক নিজেও একজন নাট্যকর্মী। তাই এ লেখায় বিধৃত প্রশ্ন সমূহের দায় থেকে লেখক নিজেও মুক্ত নয়। এমতাবস্থায় এই লেখা কেউ ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীগত অস্বস্তিকর অনুভূতিতে না নিয়ে আত্ম সমালোচনা ও বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে আশা করছি)
 
১) প্রশ্নবিদ্ধ নাটকের মান: নাটকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মণ্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিবৃন্দ নাটকের মান নিয়ে যথেষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা অবশ্য বর্তমান সময়ে চর্চিত নাটকের সামগ্রিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। উৎসবের সবচেয়ে দুর্বল দিক এটাই। যদিও ‘মান’ আদতে ব্যাক্তির ব্যক্তিগত অভিমত, তথাপি মাননীয় মন্ত্রী যখন জাতীয় নাট্যোৎসবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটকের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন একে সর্বজনীন মতামতের প্রতিফলন বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না। তাছাড়া মনে রাখতে হবে বর্তমানে দায়িত্বরত মাননীয় মন্ত্রী সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তো বটেই খোদ নাট্যাঙ্গনেরই মানুষ। তাই বিষয়টি এড়িয়ে যাবার সুযোগ একেবারেই নাই। উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি বড় কর্তৃপক্ষ- যার একটি নীতি নির্ধারনী ও কৌশলগত বিষয়ে সচেষ্ট আরেকটি সরকারি অর্থায়নে প্রায়োগিক কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা বিষয়টির দায় এড়াতে পারেন না। দেশের জাতীয় রাজনীতি যখন সর্বক্ষেত্রে উর্ধ্বমূখি সূচক সৃজনের নীতিতে সচেষ্ট, ক্ষমতাকাঠামোর সকল শাখা-প্রশাখা যখন এই দুটি কর্তৃপক্ষের অনুকূল সুত্রে আবদ্ধ তখন যদি মান সম্পন্ন প্রযোজনার সমাবেশে একটি জাতীয় নাট্যোৎসব না করা যায় তাহলে আর কখন করা যাবে? এই কর্তৃপক্ষ দুটি যদি ৬মাস/১ বছর আগে থেকেই লক্ষ্য স্থির করে নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে জাতীয় নট্যোৎসবের জন্য মান সম্পন্ন নাটক ছেঁকে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করত তাহলে আজ এই প্রশ্নটি উঠতো না –একথা আমি সুনিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি।
 
২) ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক বিহীন তথা শিকড় বিহীন ‘জাতীয়’ উৎসব: একটা দেশের জাতীয় নাট্যোৎসবে সেই দেশের ঐতিহ্যবাহী ধারার নাটক (অনেকে ‘লোকনাট্য’ বলেন) নাই –এমন অবস্থা কোনো ভাবেই আধুনিক ও সংস্কৃত চিন্তা নয়। যাত্রা, জারি, গম্ভীরা, আলকাপ, সংযাত্রা, গাজীর গান, রয়ানি, কুশান গান, সন্যাস গান ইত্যাদি বাংলার মাটির রসে সিক্ত দেশজ নাট্য শিল্পের ফল্গুধারা জাতীয় উৎসবের বর্ণিল আয়োজনে কেন উৎসরিত হবে না তা মোটেই বোধগম্য নয়। তাছাড়া এ সকল মৌলিক নাট্য নহর ব্যতীত উৎসবটি ‘জাতীয়’ হয় কী করে? এহেন ‘জাতীয়’ উৎসব একজন বাঙালির অস্তিত্ত্বকে হুমকির সম্মুখীন করে কি না ভেবে দেখবেন সকলে। কেউ হয়তো বলতে পারেন- এই নাট্যাঙ্গিকগুলো নানা জাতীয় আয়োজনে সন্নিবেশিত হয় বিধায় এ উৎসবে যুক্ত করা হয়নি। বিপরীতে বলা যাবে- যে নাটকগুলো উৎসবে যুক্ত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোও তো নানা জাতীয় আয়োজনে যুক্ত ছিল।
 
৩) নাটক নির্বাচনের মাপকাঠি অজানা: উৎসবের জন্য মোট ৫৮টি নাটক নির্বাচন করা হয়েছে। এ নির্বাচনের মাপকাঠি কী? –পরিস্কার নয়। শুধু জাতীয় ফোরামের সদস্য নাট্যদলগুলোই কি এ উৎসবের অংশীদার? মনে হয় না। কারণ জাতীয় ফোরামভূক্ত কয়েকটি নাট্যদল, যারা নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন করে তাদের নাম তালিকায় নেই। আবার নিয়মিত নাট্যচর্চা করে কিন্তু জাতীয় ফোরামভুক্ত নয় –এমন নাট্যদলের নামও তালিকায় নেই। বলে রাখা দরকার- যদি ‘শুধু জাতীয় ফোরামভুক্ত নাট্যদল সমূহের অংশগ্রহণে এই উৎসব হবে’ বলে কোন নীতি বা দাবি করা হয় তাহলে যে কোনো বিবেকবান মানুষই বলতে পারেন- ‘এই উৎসব কোনো ভাবেই দেশের জাতীয় নাট্যোৎসব নয়’। ঐ ফোরামের নিজস্ব জাতীয় নাট্যোৎসব।
 
৪) সেমিনার/সিম্পোজিয়াম নাই: উৎসবে কোনো সেমিনার/সিম্পোজিয়াম নেই। ৪টি লেকচার ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। লেকচার ওয়ার্কশপ অবশ্যই হওয়া দরকার। কিন্তু লেকচার ওয়ার্কশপ কখনোই সেমিনার সিম্পোজিয়ামের বিকল্প হতে পারে না। সেমিনার/সিম্পোজিয়ামে প্রদর্শিত নাটক সমূহের শৈল্পিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যত সৃজনকর্মের দিক নির্দেশনাসহ নানা বিষয় অবতারণ ও সুষ্ঠু বিতর্কের সুত্রপাত হবে। লেকচার ওয়ার্কশপ নিশ্চয়ই সে চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
 
৫) প্রকাশনা কি হবে?: গৎবাঁধা ‘উৎসব স্মারনিকা’ ব্যাতীত উৎসবকে ঘিরে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকাশনা ইতোপূর্বে যেমন দেখা যায়নি এবারের উৎসবেও তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিছু না হোক অন্তত একটা ‘উৎসব স্মারক গ্রন্থ’ও যদি প্রকাশ করা যায় তাতে উৎসবের নানা দিক বিধৃত হয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ হতে পারে।
 
৬) গুণীজনদের সম্মাননা: নাট্যাঙ্গনে নানাভাবে সম্মাননা জাননো হয়। কিন্তু জাতীয় নাট্যোৎসবে গুণীজন সম্মাননার গুরুত্ব ভিন্ন। এ ধরণের সম্মাননা গুনীজনের জন্য জাতীয় সম্মাননার গুরুত্ব সৃষ্টি করে।
 
৭) প্রয়াত নাট্যজন/নাট্যকর্মী বিস্মৃতই থেকে যাবে: উৎসব আয়তনে কিংবা কর্মকাণ্ডে প্রয়াত নাট্যজন কিংবা নাট্যকর্মী স্মরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যদের কথা না-ই বা বললাম, অনূজপ্রতিম নাট্যকর্মী তনয়কে গত নাট্যোৎসবে যে ব্যস্ততায় ছুটাছুটি করতে দেখেছি এবারের উৎসবে বুঝি তাকে একটু স্মরণ করতেও মানা!
 
৮) প্রতিদিনকার প্রদর্শিত নাটকের দর্শক-নির্মাতা মতবিনিময় কোথায় গেল?: আগের দিনের নাটেকের নির্দেশক-কূশীলববৃন্দ ‘উষ্ণ আসন (Hot Seat)’ –এ বসবেন এবং নবীশ নাট্যকর্মীসহ বিদগ্ধ দর্শকের ‘গরম গরম’ প্রশ্নের জবাব দিবেন –এমন উত্তেজনা পূর্ণ প্রাণের আয়োজন তো অনেক নাট্যোৎসবে দেখেছি। এবারে নেই কেন? দিন দিন আমরা সবাই বুঝি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছি?
 
৯) দর্শক নাই, দর্শক নাই, দর্শক নাই: উৎসবে কোনো দর্শকই নাই। কেউ হয়তো বলবেন- ‘এটা কেমন কথা? কিছু তো আছে।’ আসলে উৎসবের জন্য যে চারটি মিলনায়তনে নাটক প্রদর্শন হচ্ছে সেগুলোতে উৎসবের আগে যে ক’জন দর্শক আসতো এখন তার চেয়ে বেশী দর্শক আসছে বলে আমার কাছে কোনো ভাবেই মনে হয়নি। তাই আমি বলবো উৎসবে কোনো দর্শক নেই। দর্শক আনার জন্য আয়োজকদের কোনো পরিকল্পনা ছিল বলেও মনে হয় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৫০% (বা অন্য কোনো কমিশনের) কুপন সরবরাহ, কিংবা ঢাকা শহরের সরকারি অফিসের কর্মচারিদের অফিস শেষে বাসাগামী স্টাফবাসগুলো ১ ঘন্টার জন্য এসে মিলনায়তনের সামনে দাড়াঁনো এবং নাটক দেখা (এ ক্ষেত্রে টিকেটের মূল্য সংশ্লিষ্ট অফিস বহন করতে পারে) –এ ধরণের নানা উদ্যোগই হয়তো তারা নিতে পারতেন।
 
১০) আড্ডা দিতে চাই: উৎসবে কোনো আড্ডার ব্যবস্থা নেই। নাট্যকর্মীদের আন্ত:ব্যক্তিক সম্পর্ক সৃজন ও উন্নয়নের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব উপলক্ষে অনেক জেলা শহরের দল আসে। আড্ডা তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক সৃজন করতে পারতো
 
১১) আন্ত শিল্পমাধ্যম সংযোগ এবারও হলো না: চলচ্চিত্র, চারুকলা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তিসহ অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের কর্মিদের সাথে একটা সংযোগ সৃষ্টি করতে পারতো এই উৎসব। উৎসবের সময় নাটকের ভেন্যুর সামনে কিছু আবৃত্তি-সংগীত-নৃত্যানুষ্ঠান হতে পারতো। সব সময় তো হয়। বিভিন্ন দলের উৎসবেও হয়। এই উৎসবেই শুধু নাই। তাছাড়া ৪টি মিলনায়তনে যদি ১০০জন চিত্র শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতো তাহলে নিশ্চিতভাবে উৎসবের নতুন মাত্রা যুক্ত হতো।
 
১২) প্রায় প্রচারবিহীন নিরুত্তাপ নাট্যোৎসব: দেশব্যাপী তো দূরের কথা রাজধানীব্যাপী কোন প্রচার নেই। এমনকি উৎসব ভেন্যুগুলোর ১০০ গজ দূর থেকেও বোঝার উপায় নেই যে এখানে বাংলাদেশের ‘জাতীয়’ নাট্যোৎসব হচ্ছে। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন- ‘ব্যাপক প্রচারে কি দর্শক সমাগম বৃদ্ধি পেতো?’ জবাবে বলা যাবে- দর্শক বৃদ্ধি পেতো কি পেতো না তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে জাতীয় নাট্যোৎসবের সংবাদ একজন নাগরিকের মনে গৌরবের অনুভূতি সৃষ্টি করতো যে, ‘আমি এমন এক জাতির অংশীদার যে জাতির একটি জাতীয় নাট্যোৎসব হয়’।
 
১৩) দেশি-বিদেশি কোনো পর্যবেক্ষক নেই: বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যোৎসবের যে সময় পরিক্রমা তাতে এতদিনে আমাদের জাতীয় নাট্যোৎসবে দেশি তো বটেই বেশ ক’জন বিদেশী পর্যবেক্ষকও থাকতে পারতো। কিন্তু বিদেশী বা দেশী কোন পর্যবেক্ষক এখনো আমাদের চোখে পড়েনি।
 
১৪) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কোনো বিশেষত্ত্ব নেই: অলিম্পিক কিংবা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী (এবং সমাপনীতে) বিশেষ বৈশিষ্ট মণ্ডিত বাঙময় অনুষ্ঠান করা হয়। সে সকল অনুষ্ঠান শুধু শিল্প সৌন্দর্যের জন্যই নয় ইতিহাস ঐতিহ্য এবং কারিগরি উপস্থাপনারও এক একটি অনন্য উদাহরণ। আমাদের জাতীয় নাট্যোৎসব ঐ ধরণের বিশাল আয়োজনের হতে হবে –এমন বলছি না, তবে পরিকল্পনায় তথা চেতনায় সে ধরণের কোন সৃজনশীল মাত্রার স্ফুরণ হতে পারতো। অথচ যে মাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হলো তা যে কোনো নাট্যদলের নিজস্ব নাট্যোৎসবের চাইতে অধিক মাত্রার কিছু হয়েছে বলে মনে হয়নি।
 
১৫) একাডেমিগুলো নেই: স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্যচর্চার অন্যতম অর্জন- একাডেমিক নাট্যচর্চা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নাটকের স্কুল সমূহ আমাদের নাট্যচর্চার অংশীদার। বিশেষত, এই একাডেমিগুলো প্রযোজনা পরিকল্পনায় প্রায়শই এমন এমন অভিনবত্ত্বের পরিচয় দেয় যে আমরা নড়েচড়ে বসি। অথচ এই একাডেমিগুলো জাতীয় নাট্যোৎসবে অনুপস্থিত।
 
(লেখাটি সংগ্রীহিত)
লেখক: অভিনেত্রী ও কস্টিউম ডিজাইনার