বিশেষ সংবাদ:

নাট্যকার শেক্‌সপিয়রের জন্মদিন

Logoআপডেট: রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭

ফারুক হোসেন শিহাব 

উইলিয়াম শেক্‌সপিয়র ছিলেন একজন ইংরেজ কবি ও নাট্যকার। তাকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক এবং বিশ্বের একজন অগ্রণী নাট্যকার মনে করা হয়। ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। স্ট্র্যাটফোর্ড অন-অ্যাভন ছিল জন শেক্‌সপিয়রের বাড়ি, সেজন্য এটিকে শেক্‌সপিয়রের জন্মস্থল মনে করা হয়। বলা হয়ে থাকে এখানেই শেক্‌সপিয়রের বেড়ে ওঠা।
উইলিয়াম শেক্‌সপিয়রের পিতা জন শেক্‌সপিয়র ছিলেন একজন সফল গ্লোভার ও অল্ড্যারম্যান। তার আদি নিবাস ছিল স্নিটারফিল্ডে। শেক্‌সপিয়রের মা মেরি আরডেন ছিলেন এক ধনী ভূম্যধিকারী কৃষক পরিবারের সন্তান। ১৫৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল তার ব্যাপ্টিজম সম্পন্ন হয়। তিনি তার পিতামাতার আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয় এবং জীবিত সন্তানদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ।

সেযুগের কোনো লিখিত প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, অধিকাংশ জীবনীকার মোটামুটি একমত যে শেক্‌সপিয়র সম্ভবত স্ট্র্যাটফোর্ডের কিংস নিউ স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। ১৫৫৩ সালে এই মুক্ত বিদ্যালয়টি সনদ পায়। স্কুলটি শেক্‌সপিয়রের বাড়ি থেকে পৌনে-এক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। এলিজাবেথীয় যুগে গ্রামার স্কুলগুলোর মান সর্বত্র সমান ছিল না। তবে স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রম সারা ইংল্যান্ডেই আইন দ্বারা নির্দিষ্ট করা ছিল। এই কারণে মনে করা হয়, স্কুলে লাতিন ব্যাকরণ ও ধ্রুপদি সাহিত্যের বিস্তারিত পাঠ দেয়া হতো।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি অ্যানি হ্যাথাওয়েকে বিবাহ করেন। অ্যানির গর্ভে শেক্‌সপিয়রের তিনটি সন্তান হয়েছিল। এরা হলেন সুসান এবং হ্যামনেট ও জুডিথ নামে দুই যমজ। ১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অভিনেতা ও নাট্যকার হিসেবে লন্ডনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লর্ড চেম্বারলেইন’স ম্যান নামে একটি নাট্যকোম্পানির তিনি ছিলেন সহ-সত্বাধিকারী। এই কোম্পানিটিই পরবর্তীকালে কিংস মেন নামে পরিচিত হয়।

উইলিয়াম শেক্‌সপিয়রকে ইংল্যান্ডের “জাতীয় কবি” এবং “বার্ড অব অ্যাভন” (অ্যাভনের চারণকবি) হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। তার যে রচনাগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে ৩৮টি নাটক, ১৫৪টি সনেট, দুটি দীর্ঘ আখ্যানকবিতা এবং আরো কয়েকটি কবিতা। কয়েকটি লেখা শেক্‌সপিয়র অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে যৌথভাবেও লিখেছিলেন।
শেক্‌সপিয়রের পরিচিত রচনাগুলোর অধিকাংশই মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৫৮৯ থেকে ১৬১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। তার প্রথম দিকের রচনাগুলো ছিল মূলত মিলনান্তক ও ঐতিহাসিক নাটক। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে তার দক্ষতায় এই দুটি ধারা শিল্পসৌকর্য ও আভিজাত্যের মধ্যগগনে উঠেছিল। এরপর ১৬০৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানত কয়েকটি বিয়োগান্ত নাটক রচনা করেন। এই ধারায় রচিত তার হ্যামলেট, কিং লিয়ার ও ম্যাকবেথ ইংরেজি ভাষার কয়েকটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি। জীবনের শেষ পর্বে তিনি ট্র্যাজিকমেডি রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই রচনাগুলো রোম্যান্স নামেও পরিচিত। এই সময় অন্যান্য নাট্যকারদের সঙ্গে যৌথভাবেও কয়েকটি নাটকে কাজ করেন তিনি।

তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত নাটকগুলোর প্রকাশনার মান ও প্রামাণ্যতা সর্বত্র সমান ছিল না। ১৬২৩ সালে তার দুই প্রাক্তন নাট্যসহকর্মী দুটি নাটক বাদে শেক্‌সপিয়রের সমগ্র নাট্যসাহিত্যের ফার্স্ট ফোলিও প্রকাশ করেন।
তার সমকালে শেক্‌সপিয়র ছিলেন একজন সম্মানিত কবি ও নাট্যকার। কিন্তু মৃত্যুর পর তার খ্যাতি হ্রাস পেয়েছিল। অবশেষে ঊনবিংশ শতাব্দীতে খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। রোম্যান্টিকেরা তার রচনার গুণগ্রাহী ছিলেন। ভিক্টোরিয়ানরা রীতিমতো তাকে পূজা করতেন; জর্জ বার্নার্ড শ’র ভাষায় যা ছিল চারণপূজা (bardolatry)। বিংশ শতাব্দীতেও গবেষণা ও নাট্য উপস্থাপনার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার রচনাকে পুনরাবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়। আজও তার নাটক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুচর্চিত। সারাবিশ্বের নানা স্থানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা আঙ্গিকে এই নাটকগুলো মঞ্চস্থ ও ব্যাখ্যাত হয়ে থাকে।

১৬২৩ সালে ফার্স্ট ফোলিওতে প্রকাশিত হয় শেক্‌সপিয়রের ৩৬টি নাটক। নাটকগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো : মিলনান্তক (কমেডি), ঐতিহাসিক (হিস্ট্রি) ও বিয়োগান্তক (ট্রাজেডি)। যে দুটি নাটক ফোলিওর অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সেগুলো হলো- দ্য টু নোবল কিনসমেন ও পেরিক্লিস, প্রিন্স অব টায়ার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দুই নাটকের অধিকাংশটাই শেক্‌সপিয়রের রচনা। সেই হিসেবে এই দুটি নাটককেও শেক্‌সপিয়রের নাট্যসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। শেক্‌সপিয়রের কোনো কবিতাই ফোলিওর অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এডওয়ার্ড ডওডেন শেক্‌সপিয়রের শেষ জীবনের চারটি কমেডিকে “রোম্যান্স” নামে চিহ্নিত করেন। যদিও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এই চারটি নাটককে “ট্রাজিকমেডি” নামে চিহ্নিত করার পক্ষপাতি। ১৮৯৬ সালে ফ্রেডরিক এস. বোয়াস অল’স ওয়েল দ্যাট অ্যান্ডস ওয়েল, মেজার ফর মেজার, ট্রলিয়াস অ্যান্ড ক্রেসিডা ও হ্যামলেট নাটক চারটির জন্য “প্রবলেম প্লে” নামে একটি শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি লেখেন, “বিষয়বস্তুগত সমতা ও সমধর্মিতা-সম্পন্ন নাটকগুলোকে নিছক কমেডি বা ট্রাজেডি বলা যায় না। তাই আমাদের আজকের থিয়েটার থেকে যথোপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করতে হবে এবং এ নাটকগুলোকে শেক্‌সপিয়রের “প্রবলেম প্লে” শ্রেণির অন্তর্গত করতে হবে।” এই শব্দবন্ধটি যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

যেসব নাটকগুলো অংশত শেক্‌সপিয়রের লেখা, সেগুলোকে নীচে ছোরা চিহ্নিত করা হয়। অন্য যেসব লেখা কখনো সখনো তার লেখা বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে, সেগুলো “অপ্রামাণিক রচনা” অংশের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৬১৩ সালে তিনি নাট্যজগৎ থেকে সরে দাঁড়ান এবং স্ট্র্যাটফোর্ডে ফিরে যান। ১৬১৬ সালেরর ২৩ এপ্রিল সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।

২৩ এপ্রিল শেক্‌সপিয়রের জন্মদিনকে ঘিরে প্রতিবছরই সমগ্র বিশ্বে আয়োজন করা হয় বর্ণিল আনুষ্ঠানিকতা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। যথাযোগ্যমর্যাদায় বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে শেক্‌সপিয়র জন্মবার্ষিকী। বিশ্বখ্যাত এ নাট্যকার স্মরণে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় এরই মধ্যে নির্মিত হয়েছে সৈয়দ শামসুল হক অনুদিত বিশ্ব আলোচিত নাটক ‘হ্যামলেট’। ১৬ এপ্রিল রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে ছিল ‘হ্যামলেট’ প্রযোজনার উদ্বোধনী মঞ্চায়ন। ‘হ্যামলেট’ উইলিয়াম শেক্‌সপিয়র রচিত বিশ্ববাসীর অতি পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি বিয়োগান্ত নাটক।

উইলিয়াম শেক্‌সপিয়রের ৪০০তম মৃত্যুবার্ষিকী ও ৪৫২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বছরব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে শিল্পকলার প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে নাটকটি।