বিশেষ সংবাদ:

সুচিত্রা কেনো কিংবদন্তি

Logoআপডেট: সোমবার, ১৫ মে, ২০১৭

ফারুক হোসেন শিহাব

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিনয় জীবনে মাত্র ৬১টি ছবিতে অভিনয় করেছেন বাংলা সিনেমার কীর্তিমান এই নায়িকা। বাংলা চলচ্চিত্রের রানী সুচিত্রা সেনের অভিনয় শৈলী মুগ্ধ করেছে কোটি ভক্তের হৃদয়। বাংলাদেশের পাবনা জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। কিন্তু কীভাবে তিনি রমা থেকে সুচিত্রা হয়ে কিংবদন্তির তোকমা নিয়ে সবার মনে আসীন হয়ে আছেন আজো। নিউজজি২৪ডটকম-এর পাঠকদের জন্য তার বর্ণিল কর্মযজ্ঞের একঝলক নিয়ে আজকের এ আয়োজন-

সুচিত্রা সেন ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনাস্থ তার নানাবাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। তখন তার নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। বাংলাদেশের পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে করুণাময় দাশগুপ্ত আর ইন্দিরা দাশগুপ্তের পরিবারে চোখ মেলে রমা। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় কন্যা সন্তান হলেও রমার জন্মে আপ্লুত স্কুল শিক করুণাময় পুরো এলাকার মানুষকে মিষ্টিমুখ করান সেদিন।

শিানুরাগী পরিবারের মেয়ে রমা পাবনার মহাখালী পাঠশালার পাঠ শেষ করে পা দেন পাবনা গার্লস স্কুলে; দশম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই। ১৯৪৭ সালের কথা। ওই দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রমার। দিবানাথের মামা বিমল রায় ছিলেন তখনকার খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা। ভাগ্নেবধূ রমাকে তিনিই নিয়ে আসেন রূপালী পর্দায়। রত্ন চিনতে তিনি যে ভুল করেননি, তার প্রমাণ পরের ২৫ বছর ভারতবর্ষের মানুষ পেয়েছে। 

 রূপালী পর্দায় শুরুটা হয়েছিল ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মধ্য দিয়ে। যদিও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরের বছরই মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেধে অভিনয় করা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ছবিটি তখন বাজিমাত করে। আর পিছনে ফিরতে হয়নি সুচিত্রাকে। শুরু হয় স্বর্ণালী কর্মযজ্ঞের অনবদ্য ইতিহাস।

সবার চোখে সুচিত্রা

সুচিত্রা সেন, নামটি যেন সবার চোখে আজন্মের কোনো তরুণী। সদা হাস্য-ভাষ্য আর মায়াময়ী রূপমায় চটপটে এক ষোড়শী। যে হয়ে ওঠে সকলের স্বপ্নের নায়িকার মতই স্নিগ্ধ, সুন্দর। বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহানায়িকার জীবনটা স্বপ্নকাতর বাঙালির কাছে ছিলো রূপকথার মতোই। অনিন্দ্যসুন্দর মুখ, মূর্তিমতী লাবণ্য, সৌন্দর্য, আকর্ষণীয় শারীরিক গড়ন ও অতুলনীয় অভিনয়ের সুবাদে তিনি পৌঁছেছিলেন খ্যাতির শিখরে। সুচিত্রার চুল, চোখ, সাজগোজ ছিলো বাঙালি মেয়েদের কাছে ফ্যাশনের সমার্থক। তখনকার সমাজে পুরুষদের কাছে প্রেমিকার আদল ছিলেন সুচিত্রা। তাকে দেখলেই মনে হতো পাশের বাড়ির কোনো মেয়ে বুঝি!

পাবনার রমা থেকে কলকাতার সুচিত্রা

বাংলাদেশের পাবনা জেলার একটি মেয়ে রমা দাশগুপ্ত কলকাতা গিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন। এরপর চলচ্চিত্র অভিনয়ে নির্মাণ করেছেন ২৫ বছরের এক অনন্য অধ্যায়। নায়িকা থেকে হয়ে উঠেছেন মহানায়িকা। তার শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে পাবনার আলো-হাওয়াতেই। পড়াশোনা করেছেন পাবনার মহাখালী পাঠশালা ও পাবনা গার্লস স্কুলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় আরও অনেক হিন্দু পরিবারের মতো রমার পরিবারও পাড়ি জমায় কলকাতায়।

একই বছরে কলকাতায় বসবাসরত ঢাকার আরেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রমার। নামের শেষে স্বামীর উপাধি যোগ করে তিনি হয়ে যান রমা সেন। দিবানাথের মামা বিমল রায় ছিলেন তখনকার খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা। ভাগ্নেবধূ রমাকে তিনিই নিয়ে আসেন চলচ্চিত্রের পর্দায়। শ্বশুরের আগ্রহ আর স্বামীর উৎসাহে রূপালী জগতে নাম লেখানো রমা হয়ে যান সুচিত্রা সেন। এরপর ২৫ বছরের অভিনয় ক্যারিয়ারে সৃষ্টি করেন নির্মল এক ইতিহাস। যা এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অন্তরিক্ষে অমর করে রেখেছে অভিনয়ের এই সরস্বতীকে। 

উত্তম-সুচিত্রা জুটি

উত্তম-সুচিত্রা জুটি এখনো দাগ কাটে কোটি ভক্তের মনের গহীনে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এই জুটির পথচলা। এরপর একে একে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বাইরে ব্যক্তি জীবনেও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে উত্তম-সুচিত্রার মধ্যে। ১৯৫৪ সালে একটি পোস্টার ঝড় তোলে উত্তম-সুচিত্রার সংসার জীবনে। সুচিত্রার স্বাক্ষরসহ ওই পোস্টারে লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হলো অগ্নিপরীক্ষা’।

ভারতীয় পত্রিকাগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়, সেই পোস্টার দেখে উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরিদেবী সারাদিন কেঁদেছিলেন। আর সুচিত্রাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন স্বামী দিবানাথ। অভিনয় ছেড়ে দিতেও চাপ দেন। ১৯৫৪ সালেই এ জুটির ৬টি ছবি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। অন্তত ১০টি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন দুজন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই অভিনয় ছাড়তে রাজি হননি সুচিত্রা। ১৯৫৭ সালে উত্তম কুমার তার প্রযোজিত 'হারানো সুর' ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলে সুচিত্রা বলেছিলেন, 'তোমার জন্য সব ছবির ডেট বাতিল করব।’

একদিন সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাসায় এক পার্টিতে দিবানাথের আক্রমণের মুখেও পড়তে হয় উত্তমকে। এরপর থেকেই দিবানাথের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে সুচিত্রার। এক সময় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। এভাবেই কাটে কিংবদন্তী এই অভিনেত্রীর শেষ জীবন।

রহস্যজনক অন্তরালে সুচিত্রা

মহানায়িকা সুচিত্রা সেন ২৫ বছর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর রহস্যজনকভাবে প্রায় ৩৫ বছর ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৯৭৮ থেকে ২০১৪ সাল, প্রায় তিনটি যুগ ঠিক কোন অভিমানে তিনি অন্তরালে জীবনযাপন করেছেন? এই কাহিনী আজও রহস্য সৃষ্টি করে আছে সুচিত্রা ভক্তদের মধ্যে। অন্তরাল ভেঙে প্রথমে তিনি বাইরে আসেন মহানায়ক উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর। মাঝরাত পর্যন্ত বসেছিলেন তার মরদেহের পাশে। সুচিত্রা শেষ জনসমক্ষে আসেন ১৯৮৯ সালে, তার গুরু ভরত মহারাজের মৃত্যুর পর। ২০০৫ সালে সুচিত্রাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলেও ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নিতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দিল্লি যেতে রাজি হননি তিনি।

 অভিনয়ে প্রস্ফুটিত সুচিত্রা

সুচিত্রা সেন অভিনীত প্রথম ছবি ছিল ‘শেষ কোথায়’। ১৯৫২ সালে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি পরে আর মুক্তি পায়নি।  ১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় হিন্দি ‘দেবদাস’ ছবিতে দীলিপ কুমারের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান সুচিত্রা। ‘পার্বতী’চরিত্রে তার অভিনয়ে বিমোহিত হয় দর্শক। এ ছবিটি তাকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার। এরপর একে একে অভিনয় করেন শাপমোচন, সাগরিকা, পথে হলো দেরি, দীপ জ্বেলে যাই, সবার উপরে, সাত পাকে বাঁধা, দত্তা, গৃহদাহ, রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্তর মতো দর্শকপ্রিয় সব ছবিতে।

ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি এসে ‘আঁধি’ ছবিতে রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নতুন উচ্চতায় মেলে ধরেন। এই ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছিল বিহারের রাজনীতিক তারকেশ্বরী সিনহার জীবনী অবলম্বনে। কিন্তু সুচিত্রা সেন পর্দায় হাজির হয়েছিলেন ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ‘স্টাইল’ নিয়ে। চলচ্চিত্রটির কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মুক্তি দেওয়ার ২০ সপ্তাহ পরে 'নিষিদ্ধ' হয় ‘আঁধি’। দুই যুগের অভিনয় জীবনে বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে ৬০টির বেশী ছবিতে অভিনয় করেন সুচিত্রা। সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিতে অভিনয় করেন সুচিত্রা।

সুচিত্রার সম্মাননা-স্বীকৃতি

সুচিত্রা সবসময়ই মনে করতেন দর্শকই তার একমাত্র অবলম্বন, অনুপ্রেরণা এবং এগিয়ে চলার মূল উৎস। যেজন্য তিনি দর্শক-ভক্তদের ভালোবাসাকেই শ্রেষ্ঠ পাওয়া বলে মনে করতেন। যদিও সব কিছু উপেক্ষা করে অজানা অভিমানে দীর্ঘ সময় তিনি অন্তরালে থেকেছেন। জীবদ্দশায় ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে ‘মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান সুচিত্রা। ভারতীয় কোনো অভিনেত্রীর জন্য সেটিই ছিল বড়মাপের প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার পান ১৯৭২ সালে, ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পুরস্কার বঙ্গবিভূষণ অর্জন করেন। ৩৫ বছর অন্তরালে থাকার পর ২০১৪ সালে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।