বিশেষ সংবাদ:

কিশোর কুমার সঙ্গীতের বিরল এক সুরমালী

Logoআপডেট: শনিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৮

ফারুক হোসেন শিহাব

জাদুকরি কণ্ঠ নিয়েই যেন জন্মেছিলেন তিনি। যে কণ্ঠমায়ায় মুহূর্তের মধ্যে চারিদিকে খিলিখিলিয়ে উঠে প্রকৃতি। মোহনীয় কোমলীয়, মিষ্টি-মধুর ছিল তার কণ্ঠ, অথচ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গায়ক ছিলেন না তিনি।  জীবনের নিঁর্দিষ্ট একটি সময় বাদ দিলে তার পুরো জীবনটাই সাফল্যে ভরপুর। একজন সফল অভিনেতা, গায়ক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীতপরিচালক।

বাংলা এবং হিন্দি- দুই ভাষার চলচ্চিত্রেই সমানভাবে দাপট নিয়ে চলেছেন তিনি। মৃত্যুও তাকে থামাতে পারেনি। আজও তার গান সমান জনপ্রিয়। ছোট থেকে বড় সবাই তার গানে মুগ্ধ। তার কণ্ঠ যেন সকল শ্রোতাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। বলছি, ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বাধিক সফল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে-খ্যাত কিশোর কুমারের কথা। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বাধিক সফল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে বিবেচিত।

আজ তার ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৭ সালের আজকের দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন কীর্তিমান এই সঙ্গীত প্রতিভা। ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট কিংবদন্তি কিশোর কুমার ভারতের মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়াতে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি ছিলেন একজন উকিল। মায়ের নাম ছিল গৌরী দেবী। কিশোর কুমারের ছোটবেলায় নাম ছিল আভাস কুমার গাঙ্গুলি। চার ভাই-বোনের ভিতর কিশোর ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সব থেকে বড় ছিলেন অশোক কুমার তারপর সীতা দেবী। তারপর অনুপ কুমার আর অনুপ কুমারের থেকে পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন কিশোর কুমার।

কিশোরের শৈশবকালীন সময়েই তার বড়দা অশোক কুমার বোম্বেতে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে বড় সাফল্য পান। এই সফলতা ছোট্ট কিশোরের উপরে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলা থেকেই কিশোর বিখ্যাত গায়ক কুন্দন লাল সায়গলের একজন বড় ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সায়গলের গানগুলো অনুকরণ করতেন বা নকল করে গাইতেন। 

 

কিশোর কুমার ছিলেন উপমহাদেশের সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের ঈর্ষণীয় প্রতিভা। অভিনয় খুব একটা পছন্দ ছিল না কিশোর কুমারের। সব সময় তিনি গান গাইতেই চাইতেন। কিন্তু তার গানের কোনো ধরাবাঁধা শিক্ষা ছিল না। দাদা অশোক কুমারের ফিল্ম জগতে অনেক পরিচিতি থাকার ফলে কিশোর বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান কিন্তু সেগুলো দর্শকদের মনে তেমন সাড়া জাগাতে পারেননি। তবে এই সিনেমাগুলোয় তিনি গান গাইবার সুযোগ পেতেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় বাঙালি গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, স্ক্রিপ্ট লেখক, চিত্রনাট্য লেখক এবং রেকর্ড প্রযোজক।

তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগই ছিল কমেডি ধাঁচের। লোক হাসানোয় তার অন্ত ছিল না- সেটি পর্দার ভিতরে হোক বা বাইরে। বিভিন্ন ধাঁচের গান গেয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, তার মতো কেউ নেই, কিশোর কুমার শুধু একজনই হতে পারে। যে কণ্ঠ মুহূর্তেই এমন এক পরিবেশ তৈরি করে দেয় যেন মনে হয় চারিদিকে খিলিখিলিয়ে উঠেছে প্রকৃতি।

এই প্রাথমিক অবস্থায় তিনি কুন্দন লাল সায়গলের নকল করে গাইতেন। পরে শচীন দেব বর্মণের পরামর্শে তিনি নিজের গাইবার কায়দা পাল্টান এবং এমন এক গাইবার কায়দা উদ্ভাবন করেন যা সেই সময়ের অপর প্রধান দুই গায়ক মহম্মদ রফি এবং মুকেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার গানের বৈশিষ্ট্য ছিল গলাকে ভেঙে গান গাওয়া যা আগে কখনো শোনা যায়নি। তবে এই কায়দা খুবই জনপ্রিয় হয়।

পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত কমেডি নায়ক হিসাবে জনপ্রিয় হন। তার অভিনয়ের কায়দা ছিল অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময়ের প্রবল জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাশালী তিন নায়ক - রাজ কাপুর, দেব আনন্দ এবং দিলীপ কুমার বলিউড শাসন করা সত্ত্বেও কিশোর কুমার নিজের এক পৃথক জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন।

  এই সময়টাতে তিনি ছিলেন এক প্রবল ব্যস্ত, সফল নায়ক এবং গায়ক। এ ছাড়াও তিনি সুরকার, গীতিকার এবং প্রযোজকের ভূমিকাও পালন করতে থাকেন। শচীন দেব বর্মণ ছাড়াও খেমচাঁদ প্রকাশের সুর জিদ্দি সিনেমার গান গেয়ে কিশোর গায়ক হিসাবে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করে। এছাড়া অন্যান্য সুরকার যেমন রবি এবং দুই বিশিষ্ট গীতিকার- মজরু সুলতানপুরি ও শৈলেন্দ্র হয়ে ওঠেন কিশোরের একনিষ্ঠ ভক্ত।

১৯৬৯ সালে শক্তি সামন্ত’র আরাধনা শুভমুক্তি পায়। এই সিনেমার নায়ক ছিলেন রাজেশ খান্না। তার জন্য এই সিনেমায় কিশোর তিনটি গান গেয়েছিলেন- ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’ লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে। আর দুটি হলো- রূপ তেরা মস্তানা এবং ‘মেরে স্বপ্ন  কি রানি’। তিনটি গানই বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং কিশোর কুমারের সঙ্গীতজীবনকে আরো উজ্জ্বল করে তোলে। এই সিনেমায় রূপ তেরা মস্তানা গানের জন্য কিশোর প্রথমবার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পান।

পরবর্তী বছরগুলোতে কিশোর গায়ক হিসাবে ব্যাপক সাফল্যতা লাভ করেন। সে সময়ে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত সব নায়ক যেমন- রাজেশ খান্না, শশী কাপুর, ধর্মেন্দ্র, রণধীর কাপুর, সঞ্জীব কুমার এবং দেব আনন্দের গলায় তিনি গান করেন। এই সময়ে শচীন দেব বর্মণ এবং রাহুল দেব বর্মণের সুরে তিনি প্রচুর কালজয়ী গান গেয়েছেন। রাহুল দেব বর্মণের সুরে তিনি বম্বে টু গোয়া সিনেমাতে প্রথমবারের জন্য অমিতাভ বচ্চনের জন্য গান করেন।

১৯৭৩ সালে অমিতাভের ‘অভিমান’ সিনেমার জন্য তার গানগুলো সুপারহিট হয়। এরফলে পরবর্তী মেগাস্টার অমিতাভের নেপথ্য গায়ক হিসাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিশোরের এই সাফল্যের পরে বলিউডের অন্য সুরকারেরাও তাকে নিজেদের প্রধান গায়ক হিসাবে বেছে নিতে বাধ্য করে। এঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল জুটি। গীতিকার আনন্দ বক্সী, সুরকার লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল এবং কিশোর কুমার জুটি বেশ কিছু রাজেশ খান্নার সিনেমার জন্য অনবদ্য সঙ্গীত উপহার দেন। যেমন দাগ, রোটি, হাথি মেরে সাথি।

কিশোর কুমার যখন ডুয়েট গান গাইতেন, দর্শকদের পুরো মনোযোগ থাকতো তার গানের দিকে। এমনকি একই গান যখন দুজন শিল্পী গাইতেন, তখন কিশোর কুমার যেই ভার্সন গাইতেন, সেটাই দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেতো। সত্যজিৎ রায়ের মতে, ‘কিশোর কুমারের গানের গলা চলচ্চিত্রের যেকোনো পরিস্থিতি মোতাবেক দৃশ্যে মানিয়ে যায়।’

লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলালের সুরেই কিশোর ও মোহাম্মদ রফি একসাথে গান করেন এবং কিশোর ও লতা মঙ্গেশকরের বেশ কিছু ভালো ডুয়েট গান তৈরি হয়। কিশোর কুমার এবং সুরকার কল্যাণজী-আনন্দজী জুটিও বেশ কিছু হিট গান উপহার দেন। যেমন ধর্মাত্মা, লাওয়ারিস, কাবিলা, জনি মেরা নাম, ডন, কাগজ, সফর, মুকাদ্দর কা সিকন্দর প্রভৃতি সিনেমার গান। সত্তর এবং আশির দশকজুড়ে কিশোরের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে। তখনকার নতুন ও অল্পবয়সী নায়ক ঋষি কাপুর এবং সঞ্জয় দত্তের জন্যও তিনি সফল গান উপহার দেন।

রাহুলদেব বর্মণের সুরেই তিনি সব থেকে বেশি হিট গান করেছেন। রাহুল এবং কিশোর জুটির কিছু অনবদ্য সিনেমার নাম হলো- শোলে, ওয়ারান্ট, হীরা পান্না, শরীফ বদমাশ, আঁধি, রকি, দ্য বার্নিং ট্রেন, আপকি কসম, আপনা দেশ, ধরম করম, টক্কর, সীতা আউর গীতা, জোশিলা, কসমে ভাদে, রামপুর কা লক্ষ্মণ, কালিয়া, গোলমাল প্রভৃতি। নতুন সুরকার যেমন রাজেশ রোশন এবং বাপ্পী  লাহিড়ী’র সুরেও তিনি বেশ কিছু হিট গান গেয়েছেন। রাজেশ রোশনের সুরে দো অর দো পাঁচ, দুসর আদমি, মনপসন্দ, এবং বাপ্পী লাহিড়ী’র সুরে নমক হালাল এবং শরাবী সিনেমার গান উল্লেখযোগ্য।

পুরো কেরিয়ারে কিশোর আটবার শ্রেষ্ঠ গায়কের ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পান। হিন্দির পাশাপাশি তিনি প্রচুর জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা এবং বাংলা আধুনিক গানও গেয়েছেন। উত্তম কুমারের জন্য তার প্লেব্যাক করা উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে- রাজকুমারী, অমানুষ, আনন্দ আশ্রম এবং ওগো বধূ সুন্দরী। একটি বাংলা ছবি লুকোচুরিতে তিনি নায়কের অভিনয় এবং গান করেছেন।

সত্যজিৎ রায়ের দুটি সিনেমা চারুলতা এবং ঘরে বাইরের জন্য তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত দুই নায়ক প্রসেনজিৎ এবং তাপস পালের কেরিয়ারের দুই উল্লেখযোগ্য হিট সিনেমা ‘অমর সঙ্গী’ এবং ‘গুরুদক্ষিণা’-তে তিনি প্লেব্যাক করেছিলেন।

শেষদিকে এসে কিশোর কুমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে রবীন্দ্র সঙ্গীতের অ্যালবাম রেকর্ড করেন। কিশোর কুমার সর্বমোট ২,৭০৩টি গান গেয়েছেন, যার মধ্যে ১১৮৮টি হিন্দি চলচ্চিত্রে, ১৫৬টি বাংলা এবং ৮টি তেলেগু ভাষায়।

অক্টোবর ১৩, ১৯৮৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান শিল্পীর মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর আগের দিনেও তিনি গান রেকর্ড করেছিলেন। বেঁচে থাকতে কিশোর কুমার তার স্ত্রী লিনা চান্দভারকারকে বলেছিলেন- ‘আমি যখন থাকব না তখন দেখো লোকে কেমন খুঁজছে আমায়! আমার কণ্ঠের ঝলক কা গলায় পেলে তাঁকে নিয়ে লোকে পাগল হয়ে যাবে কিন্তু আমায় পাবে না।’ ঠিক তাই! তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার গান এখনো গেঁথে আছে অগণিত ভক্ত-শ্রোতাদের অন্তর গহীনে। এখনো তার গান বেজে উঠলেই উচ্ছ্বল প্রাণও শিতলতায় ভরে ওঠে। তার গাওয়া গান অন্য শিল্পীর কণ্ঠে ভাসলেও কিশোরের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হন অগণিত ভক্ত-অনুরাগী। স্বর্গবাসে ভালো থাকুন প্রিয়শিল্পী কিশোর কুমার।

কিংবদন্তি এই সঙ্গীত প্রতিভার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে– ‘কি আশায় বাঁধি খেলাঘর’, ‘আমার পূজার ফুল’, ‘এক পলকের একটু দেখা’, ‘এ আমার গুরুদক্ষিণা’, ‘একদিন পাখী উড়ে যাবে যে আকাশে’, ‘এই যে নদী’, ‘আমার মনের ময়ূর মহলে’, ‘এই তো জীবন হিংসা বিবাদ লোভ হোক নিঃশেষ’, ‘হাওয়া মেঘ সরায়ে’, ‘কি উপহার সাজিয়ে দেব’, ‘তোমায় পড়েছে মনে’, ‘নীল নীল আকাশে’, ‘প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে’, ‘শুনো শুনো গো সবে’ ‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’ অন্যতম।

 

 

এবি/রায়হান