বিশেষ সংবাদ:

আমাদের মঞ্চনাটকে কবি নজরুল

Logoআপডেট: বুধবার, ২১ মে, ২০১৪
এবি প্রতিবেদক
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্য-সঙ্গীত তথা বাংলা সংস্কৃতির অনন্য সাহিত্য স্রষ্টা। তিনি প্রেমের কবি, সাম্যের কবি ও বিদ্রোহের কবি। শুধু কবিই নয় তার লেখনী ধুমকেতুর মত আঘাত হেনে আমাদের জাগিয়ে তুলেছিল বারংবার। রণাঙ্গনে, রঙ্গালয়ে, কারাগারে, চলচ্চিত্রে, নাটকে, রেডিওতে, মঞ্চে, কবিতায় এমনকি সাংবাদিকতাসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতিঙ্গনের প্রায় সব শাখায় বিরল কালউত্তীর্ণ এক নাবিকের নাম নজরুল। আমরা নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান দিয়েছি সত্যি, কিন্তু তার সৃষ্টিভা-ার নিয়ে যতটা কাজ করা দরকার তা কোনভাবেই করা হয়নি। তিনি যে বৈচিত্র্য এবং বিপুল রচনাসম্ভার নিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে এসেছিলেন তার অনেক কিছুই আজও লোকচক্ষুর অন্তরালে। নজরুল ছিলেন সাম্যের অগ্রপ্রতীক।বিশ্বের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে তিনিই চেয়েছিলেন সখ্যতা-সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। হিন্দু পরিবার প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নিজেকেও বিসর্জন দিয়েছিলেন সাম্যের যুদ্ধে। তিনি বাঙালির রক্তে বিপ্লবের তেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যতদিন পৃথিবীতে একজন বীর বাঙালি বেঁচে থাকবেন ততদিন তার রক্তে, তার হƒদয়স্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হবে নজরুলের অনবদ্য বিদ্রোহী চেতনা। অথচ আমরা এই কালোত্তির্ণ কবির কর্মযজ্ঞকে সব সময়ই নানাভাবে উপেক্ষিত করেছি। তাকে আমরা কতটাই বা জানতে পেরেছি কিংবা জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু নজরুলের জš§ বা মৃত্যুবার্ষীকির সময়টায় প্রতি বছরই টিভি চ্যানেল আর পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে কিছু একটা করার হিড়িক পড়ে যায়। তুলনামূলকভাবে নজরুল সঙ্গীতের যতটা চর্চা হচ্ছে তার নাটক বা অন্যসব সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে ততটা কাজ হচ্ছে কি?

তার নাটক নিয়ে টেলিভিশনে যতখানি কাজ হয়েছে, সে অর্থে মঞ্চে হয়েছে হাতেগোনা। এ পর্যন্ত যেসব নাটকের দল নজরুলের নাটক নিয়ে কাজ করেছেন তার মধ্যে ১৯৮৮ সালে সিরাজউদ্দৌলা থিয়েটার মঞ্চে আনে ‘রূপান্তর’ ও ‘অগ্নিগিরি’। ৯৩ সালে চট্টগ্রামের নাট্যদল তীর্যক মঞ্চে আনে নজরুলের কবিতা অবলম্বনে ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। একই দল ’৯৯-এ মঞ্চে আনে ‘মধুমালা’। ৯৯ সালে ‘ভূতের ভয়’ মঞ্চে তোলে হবিগঞ্জের দল নাট্যমেলা। ২০০১ সালে প্রতিবিম্ব থিয়েটার আনে নজরুলের ‘ভিক্ষে দাও’। ২০০২-এ বি.বাড়িয়ার দল সাহিত্য একাডেমি মঞ্চাঙ্গনে আনে ‘রাক্ষুসী’। একই সময়ে লোকনাট্যদল টিএসসি মঞ্চে আনে ‘ঝিলমিল’। ‘মধুমালা’ ২০০৮-এ মঞ্চে আনে লোকনাট্যদল সিদ্ধেশ্বরী। এছাড়াও নজরুলের ‘মানুষ’ ও ‘রাক্ষুসী’ মঞ্চে তোলে চাঁদপুরের দল অনন্য নাট্যগোষ্ঠী। ২০০৮-এ এসে ঢাকার দল জেনেসিস থিয়েটার মঞ্চে আনে ‘দামাল ছেলে নজরুল’। প্রাঙ্গনে মোর মঞ্চে আনে নজরুরেল আলেয়া অবলম্বনে ‘দ্রোহ প্রেম ও নারী’। এছাড়াও বিভিন্ন সময় নানাভাবে আমাদের মঞ্চে নজরুলের বেশকিছু শিশুকিশোর নাটক হয়েছিল। কিন্তু তা একেবারেই অপ্রতুল। তবে এরই মধ্যে তার সাহিত্যের গভীরতায় এ অঙ্গনের অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী এ বিষয়ে বলেন, ‘নজরুল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রাণ পুরুষ। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন মাধ্যম নেই, যেখানে তার কৃতিত্ব নেই। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তার প্রভাবিত বিচরণ। তার সৃষ্টিসম্ভার বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নবতর যুগের নিদর্শণ। যেমন ছিল কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, গানে তার অসাধারণ সাহিত্য গভীরতা, তেমনি নাটকের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অনন্য। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণে নজরুল নাট্যচর্চা হয়নি। এ ব্যাপারে আমাদের আরও আন্তরিক হওয়া জরুরী। এটি এখন সময়ের দাবি। তা না হলে আমাদের জাতীয় কবির প্রতি অশ্রদ্ধা-অমর্যাদা করা হবে। নজরুলকে জাতীয় কবির যে সম্মান দেয়া হয়েছে, সেটি শুধুই কাগজে-কলমে না রেখে অন্তত আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির চর্চায় যেন প্রতিফলন ঘটে। এ প্রত্যাশাই সকলের।