বিশেষ সংবাদ:

একবিংশ শতাব্দিতে আমাদের নাট্যচর্চা

Logoআপডেট: বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আমাদের থিয়েটার চর্চা একটা মুক্তধারায় প্রবাহিত হয়েছে। আবার কখনো রাষ্ট্রিয় কখনো ধর্মীয় কখনোবা সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা নাটকের স্বাতন্ত্রিক গতিকে ব্যাহত করেছে।

বহু জলাঞ্জলীর পথ ফেরিয়ে তবুও আমাদের নাটক এগিয়েছে বহুদূর। এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে একবিংশ শতকের যান্ত্রিক আঙ্গিনায় এসে ভাবতে হচ্ছে আমাদের নাটক কোনদিকে যাচ্ছে? আমরা আজও নাটককে গণ-মানুষের কাছাকাছি নিতে পেরেছি কি? আমাদের নাটক কি সত্যিকারের জীবনবোধের কথা বলে? সময়ের সমীকরণে এসে আমাদের নাটকে শিল্পের দাবিগুলো যথার্থ থাকছে কি?

এমনি বহুপ্রশ্ন আজ আমাদের তাড়িত করে। সেই বোধ থেকে একবিংশ শতাব্দির এ লগ্নে এসে আমাদের নাটকের অবস্থান, প্রকাশভঙ্গি, অভিনয় কৌশল, শিল্পগুণের বিচার,

সমস্যা-সম্ভাবনা এমনকি বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে আমাদের চলমান অবস্থাসম্পর্কে দেশের চার গুণী নাট্যনির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী, তারিক আনাম খান, অনন্ত হীরা এবং সুভাশিষ সিনহার সাথে একান্ত কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরছেন- ফারুক হোসেন শিহাব-

নব-নাট্যান্দেলনের বিপ্লবী এক নাট্যযোদ্ধা রোকেয়া রফিক বেবী। দেশের থিয়েটার চর্চাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসতে যাদের নিরন্তন প্রচেষ্টা ছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
আমাদের নাটকের আগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতা পরবর্তী বিগত চার দশকেরও বেশী সময় ধরে আমরা পরিচ্ছন্ন নাট্যচর্চা করে আসছি। এরই মধ্যে অনেক চরায়-উৎরায় পার হয়েছে। এ পর্যায়ে এসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মাধ্যমে জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন না ঘটলেও আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তথা নাট্যাঙ্গন জাতিকে মোটেও নিরাস করেনি। বরং দেশের মঞ্চ ও টিভি মিডিয়া স্বাতন্দ্রিক নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক রুচিবোধকে এক অনবদ্য চূড়োয় আসীন করেছে।

বিশেষ করে বিশ্বস্থতার  সাথেই আমাদের থিয়েটার অঙ্গন বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নাট্যজন তারিক আনাম খানের মতে, নাট্যকর্মীদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফসল হচ্ছে আমাদের আজকের সুপল্লবিত নাট্যধারা। তিনি বলেন, মঞ্চটা হয় ভালোলাগা ভালোবাসা থেকে। সমাজের কথা মানুষের কথা হৃদয়ের ক্ষত-বিক্ষত আকুতি, অর্থাৎ আমরা যা বলতে চাই তাই শিল্পের মায়াময়তায় নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
তারিক বলেন, পেশাধারীর মনভঙ্গি নিয়ে আমরা নবনাট্যান্দোলন শুরু করলেও সত্যিকার অর্থে আমাদের থিয়েটার সে জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। তবুও বলতে পারি পাশের দেশ ভারত থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও আমাদের নাট্যচর্চার অনেক উন্নতি হয়েছে।

তার মতে, ১৯৬২ সালে ভারত যখন রবিঠাকুরের শততম জন্ম বার্ষিকীকে ঘিরে সবগুলো প্রদেশে যে নাট্যযজ্ঞ শুরু করে সেই থেকে পুরো ভারতব্যাপী নাটকের একটা জাগরণ সূচীত হয়।
কিন্তু আমরা অনেক প্রতিবন্ধকতার পথ মাড়িয়ে আজকের এখানে এসেছি। যদিও নাট্যচর্চায় এখনো আমরা পূর্ণউৎকর্ষতা পায়নি। এ অর্থে নাট্য নির্মাতা অনন্ত হীরা বলেন, বাংলাদেশে এখন যথেষ্ট মানসম্মত নাট্যচর্চা হচ্ছে বলা যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যে ধরণের নাট্য চর্চা হচ্ছে সে তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে আছি। আমাদের পরিক্ষামূলক যে নাট্য চর্চা হয় তা ভারতে হয় না। আমাদের এই গবেষণাধারার তৈরি হয়েছে তারুণ্য আলোয়ে।

তার মতে, এদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী যারা নাট্য চর্চা শুরু করেছিলেন সেই পুরোধা ব্যক্তিরা সেভাবে থিয়েটার চর্চায় নেই। তাদের মধ্যে বেশীরভাগই নিঃস্ক্রীয়। নাট্যজন আতাউর রহমান, আলী যাকের, নাসির উদ্দিন ইউসূফ, মামুনুর রশীদসহ হাতে গোনা কয়েকজন এখনও থিয়েটারকে ভালোবেসে এর সাথে সক্রিয় রয়েছেন। হীরা বলেন, এখন যদি শিল্পকলায় মাসে ৭০টি নাটক মঞ্চায়ন হয় তাতে দেখা যাবে তাদের নাটক ৫-৭টি। বাকি সব নতুন জেনারেশনের।
তারা ভালোও করছে। তার মানে বর্তমান সময়ে থিয়েটারের মূল শক্তিই হচ্ছে তারুণ্য। একই সাথে বলা যায় আমরা প্রায় এক যুগ ধরে বিশ্ব নাটকের নেতৃত্ব দিচ্ছি তাওবা কম কিসে।

সম্ভাবনাময় নাট্য নির্দেশক সুভাশিষ সিনহার মতে, বৈচিত্র ও উপস্থাপনার দিক থেকে আমাদের নাটক অনেকদূর এগিয়েছে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন পরবর্তী নাট্যজন সৈয়দ জামিল আহমেদ, নাসির উদ্দিন ইউসূফ বাচ্চু, আতাউর রহমান মঞ্চনাট্য নির্মাণে তাদের একান্তই নিজস্বতা থেকে নবতর ধারার যে উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন সেই নতুনত্বের প্রচেষ্টাই মঞ্চ নাটককে আজকের জায়গায় আসীন করেছে।
তিনি বলেন, সৈয়দ জামিল আহমেদ এবং নাসির উদ্দিন ইউসূফ পুরোপুরি শরীরী নাট্যধারা যে শিল্পপ্রয়োগ সৃষ্টি করেছে তা আমাদের নাটককে অনেক সাহসের জায়গায় নিয়ে এসেছে। যে পথ ধরেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম নাট্য চর্চাকে আগামীর পথে এগিয়ে নিচ্ছে।

বিশেষ করে তাদের পরবর্তী সাইদুর রহমান লিপন রামায়নের বিশিষ্ট গায়েন গোপাল মোধককে দিয়ে ঢাবির নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ‘শীতার বনবাস’ রপ্ত করিয়েছিলেন।
লোকজ নাট্যরীতির অবয়বে আধুনিকায়নের সংমিশ্রণে যে ধারা সৃষ্টি তা আমাদের নাটককে নতুন পথের সন্ধান দেয়। অপরদিকে আজাদ আবুল কালাম স্বাধীন আধুনিকায়নের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’কে ভেঙ্গে রাজা এবং অন্যান্যে দেহের যে ভাষা ব্যাবহার রূপদান করেছেন তা আমাদের নাট্যাঙ্গনকে নবতর স্বাদ দিয়েছে। তার নাটকে সংলাপ নির্ভরতাকে ভেঙ্গে আঙ্গিক বা শরীরীয় যে প্রয়োগভঙ্গি, নাটকে প্রজেক্টরের ব্যবহার আমাদের নাটকে নতুন সংযোজন।

সুভাশিস বলেন, এসব আমাদের অনেক বড় সম্পদ। পাশ্ববর্তী দেশের নাট্য চর্চায় যেমনটি আমরা দেখতে পাইনা। পশ্চিমবঙ্গে এমনি নিজস্ব ধারা সৃষ্টির প্রবনতা খুবই কম। নাট্য নির্দেশক ফয়েজ জহিরের ‘ঊর্ণজাল’, সুদীপ চক্রবর্তীর ‘লাল জমীন’সহ বর্তমান সময়ের বেশ কিছু প্রযোজনায় পরিচ্ছন্ন থিয়েটার চর্চার যে চেষ্টা তা আমাদের নাট্যাঙ্গনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে।
আন্তর্জাতীক অঙ্গনের সাথে তাল রেখে আমাদের নাটকে বৈচিত্রতা ও বহুমাতৃকতার বিষয়ে রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, একটা সময় আমরা বিদেশী নাট্যকারদের নাটকের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের দেশীয় নাট্যকার বা পান্ডুলীপি সংকট নেই বললেই চলে।

ব্যাপক অর্থে আমি কিন্তু দেশী-বিদেশী নাটককে আলাদাভাবে দেখিনা। আমি দেখি একটা নাটকের কন্টেন্ট কি? এর মধ্যে কতোখানি বৈচিত্রতা, বহুমাতৃকতা এমনকি শিল্পবোধ রয়েছে। নাটকটি কতটা সময়ের দাবি রাখে। সে অর্থে বর্তমানে আমাদের নাট্যমান অনেকাংশে সমৃদ্ধ।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী কোলকাতায় যে নাট্য চর্চা হচ্ছে সে তুলনায় বাংলাদেশের নাটক অনেক এগিয়েছে। বিশেষ করে দু’দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ে এটাই উপনীত হয়। অবশ্য আমাদের দেশে ভারতের যেসব নাটক নিয়ে আসা হয় তার মধ্যে দেখা যায় সে দেশের অনেক ভালো নাট্যদল বা নাট্য প্রযোজনাই সুযোগ পায় না।

আবার আমাদের দেশ থেকে যেসব নাট্যদল বা নাটক ভারত কিংবা অন্যান্য দেশে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্য যায় সে ক্ষেত্রেও অনেক ভালো দল বা নাটক সুযোগ পায় না।
যদিও আন্তর্জাতীক ক্ষেত্রে এ জায়গাটি আরও পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত। অনন্ত হীরার মতে, একটি প্রযোজনায় সবার আগে দেখা দরকার এর আবেদনটি মানুষের মনগভীরকে কতটা স্পর্শ করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে  সুদীপ চক্রবর্তীর নির্মিত নাটকে বিস্বস্থতার সাথেই সেই উপলব্দি খুঁজে পাওয়া যায়। একই সাথে ভালো কিছু করার নিরন্তর চেষ্টা বা প্রয়াস থাকে। তার নির্মাণ কৌশল ও প্রয়োগ ভঙ্গিতে আধুনিকায়নের পাশাপাশি জীবনবোধের নতুন মাত্রা পাওয়া যায়।

অনন্ত হীরার দৃষ্টিতে, একটি ভালো নাটক হতে হলে প্রথমত একটা ভালো গল্প বা পান্ডুলিপি প্রয়োজন। যেখানে জীবনবোধের পাশাপাশি সময় ও শিল্পের দাবীগুলো যথার্থভাবে থাকা চাই।
আমাদের নাটকগুলোতে প্রতিনিয়ত এসবের বিচ্যুতি ঘটে। অবশ্য, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের নাটকেও বেশ এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। বলা যায় শারীরীক অভিনয়ের জায়গাটিও জোরালোভাবে দেখা হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো- মঞ্চ নাটক যেহেতু সার্কাস বা এক্রোবেটিক না সেহেতু আমাদের নাটকে শারীরীক অভিনয়ের চাইতে নাটকে ভালো গল্প, জীবনবোধ, এর আবেদন তথা প্রাণবন্ত অভিনয়ের দিকে লক্ষ রাখা জরুরী। অনেক ক্ষেত্রেই যার ব্যাগাত ঘটে। বিদেশী নাটকের বিষয় বস্তু-প্রেক্ষাপট আমাদের সাথে অনেকাংশেই মিলবেনা। সুতরাং আমাদের নাটকে গল্পের প্রয়োজনে যতোটা সমীচিন ততটাই পিজিক্যাল অভিনয় দেখানো উচিত।

সুভাশিষ সিনহা বলে, এখন আমাদের নাটকে যথেষ্ট এক্সপেরিমেন্ট হয়। মঞ্চের সম্প্রতিক প্রযোজনাগুলোতে সেই নিদর্শনই লক্ষনীয়। যেমন, মহাকাল প্রযোজিত আশিক রহমার লিয়নের ‘নিশিমন বিসর্জন’, দশরূপকের ব্যানারে নায়লা আজাদ নূপুর নির্দেশিত ‘বিসর্জন’, শামীম সাগর নির্দেশিত পালাকারের ‘ডাকঘর’ আমাদের নাটকে নতুন ধারার সংযেজন।
এছাড়াও শূণ্যনের ব্যানারে সুদীপ চক্রবর্তী নির্দেশিত ‘লাল জমীন’ এর অভিনয় প্রয়োগের ভঙ্গি, নান্দনিক কোরিওগ্রাফি আমাদের দর্শকদের তৃপ্ত করেছে। এখানে পরিমিত আয়োজনে অনেক বড় ক্যানভাস তৈরির যে প্রবল আকাঙ্খা তা অসাধারণ। নাট্য চর্চায় প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনার প্রশ্নে বেবী বলেন, বহিঃবিশ্বের থিয়েটারের তুলনায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছি।

প্রশ্ন হলো কেন আমরা পিছিয়ে আছি? এখানে প্রতিবন্ধকতা কোথায়? আমাদের প্রথম প্রতি বন্ধকতা হচ্ছে- পৃষ্ঠপোষকতার অভাব।
তারপর সময় সীমাবদ্ধতা অর্থাৎ, শুধুমাত্র ইভিনিং থিয়েটার চর্চা করে এবং নাট্যকর্মীদের পকেটের পয়সায় আমাদের থিয়েটার যে পর্যায়ে এসেছে তা সত্যি প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, থিয়েটার হচ্ছে সত্যিকারের ভালোবাসার জায়গা। এখানে শিল্পের প্রতি নিরেট প্রেম থাকা চাই। কোনভাবেই এর বিকল্প নেই। এ বিষয়ে তারিক আনাম খান বলেন, আমাদের নাটকের বিকাশে সরকারের আন্তরিকতা ও উদ্যোগের অভাব। সরকারগুলো সত্যিকার অর্থে নাটক তথা সাংস্কৃতিকে ভয় পায়।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ এবং শিল্পকলা একাডেমীকে ঘিরে সাংস্কৃতির একটা বলয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। তা পুরোপুরি না হলেও এর কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। উল্লেখযোগ্য আরেকটি সংকট হলো- আমাদের দেশে বহিঃবিশ্বের মতো থিয়েটার তথা নাট্যচর্চার প্রর্যাপ্ত ইনস্টিটিউট বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই।

দু-তিনটি বিশ্ব বিদ্যালয় ছাড়া থিয়েটারই হচ্ছে নাটকের শিক্ষা পাওয়ার মূল জায়গা। নাটকের মানুষগুলো চর্চার-শেখার যত বেশী সুযোগ পাবে আমাদের নাটক ততই পরিশালিত এবং প্রসার পাবে।
সম্ভাবনার প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের নাটকের মূল শক্তি হচ্ছে তারুণ্য। মঞ্চের মতো দেশের টেলিভিশন বা ফিল্মেও তারুণ্য বড় অ্যাসিভমেন্ট। এই তারুণ্যের সাথে নিবিড় শিল্পবন্ধন বা অভিজ্ঞতার সমণ্বয় নাট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে জরুরী। অপরদিকে  নির্দেশনা হচ্ছে শেখার ব্যপার।

এখানে জানার বিকল্প নেই। ভালো কাজ করতে হলে জীবনের গভীরে ঢুকতে হবে। একজন নাট্য নির্মাতাকে অবশ্যই জীবনবোধ, রাজনীতি সমাজনীতি এমনকি মানুষের মনের গভীরতা-উপলব্দির বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা রাখতে হবে। টিভি মিডিয়ায়ও এমনটি হওয়া চাই।
যে গুণাবলীগুলো আমাদের আনেক নাট্য নির্মাতাদের মধ্যে খুবই কম। অনন্ত হীরার মতে, আমাদের এখানে ভালো পান্ডুলিপি লেখার মত নাট্যকার হাতে গোনা। নির্দেশনার জায়গায় দু’ধরণের সমস্যা এখনও আমাদের চলার পথকে রুদ্ধ করছে। প্রথমত, সিনিয়ররা নতুনদের সুযোগ দেয়ার জায়গাটা খুবই সংকির্ণ। দ্বিতীয়ত, তরুণরাও নিজস্ব খোলাস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ততটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পুরোনো দলে এই সংকট প্রবল।

নতুন দলগুলোর মধ্যে এ ক্ষেত্রে উদারতা বেশী। সুভাশিষ সিনহার মতে, একটি নাটক মঞ্চে তুলতে আমরা যে সময় দিয়ে থাকি তা যথেষ্ট নয়। আরো অনেক বেশী সময় দিতে হবে। কিন্তু আমরা তা দিতে পারছিনা।
এর মূলই হচ্ছে বাজেট সীমাবদ্ধতা। এসব ক্ষেত্রে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া উচিৎ। এতো কিছুর পরও আমাদের নাটকে সম্ভাবনার অনেক জায়গা রয়েছে। তিনি বলেন, একটা সময় আমারা নাট্য চর্চায় শেকড়ের দিকে তাকাতাম, এখন কিন্তু তার পাশাপাশি আমারা আধুনিক থিয়েটারের দিকে প্রবাহিত হচ্ছি। অর্থাৎ আমাদের লোকজধারাতেও আধুনিকায়নের চমৎকার সংমিশ্রণ হচ্ছে।

এটি অনেক বড় অর্জন। সুভাশিষ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিতে আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের নাট্যচর্চার বিচারে আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি। কারণ, বহিঃবিশ্বের নাটকে তাদের গল্প ও প্রেক্ষাপটের আলোকে অনেক বেশী এক্রোবেটিক মুভমেন্ট বা শারীরীক কসরদ থাকে আমাদের নাটকে শরীরের ভাষা ব্যাবহারের সে জায়গাটি এখনো তৈরি হয়নি। আমাদের মধ্যে সংলাপ বলার একটা প্রবণতা হয়ে এসেছে।
আবার ফিজিক্যাল জায়গায় জোর দিতে গিয়ে নাটকের বাচিক দিকটা দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, নাটকের সংলাপে শ্রুতিমধুরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আমাদের নাট্যাঙ্গনে বিদেশী নাটকের একটা প্রভাব ছিল। সেটা এখন আর নেই। তার মতে, কবি গুরুর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গেল বছর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় সারাদেশে রবিন্দ্র নাটকের যে জাগরণ তৈরি হয় তা অবিস্বরণীয়। এতে রবিন্দ্র নাটককে ভেঙ্গে আধুনিকায়নের শৈল্পিক যে ধারা সূচীত হয়েছে তা প্রশংসার দাবী রাখে। এটি আমাদের নাটককে সৃষ্টিশীল একটি স্রোতধারায় প্রবাহিত করছে।

রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, আমাদের নাটকে সংশ্লিষ্ট দল বা মানুষগুলো যদি অন্য দেশের ন্যায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেতো, যথার্থ প্রশিক্ষণ পেতো, নিঃদ্বিধায় যদি পেশাদারী নাট্য চর্চা করতে পারতো তবে আমাদের নাটক আরও পরিচ্ছন্ন রুপ পেতো।
একইভাবে আমাদের একজন ডিজাইনার, অভিনেতা বা নির্দেশক যদি আরো অনেক সময় দিতে পারতো, আরো অনেক ভাবতে পারতো তাহলে আমরা আরও অনেক বেশী এগিয়ে যেতাম।

তিনি বলেন, আমাদের নাট্য শিক্ষার দুটি জায়গা একাডেমীক এবং প্র্যাকটিক্যাল।  এখানে নাট্যঙ্গনকে যারা সরব রেখেছে তাদের বেশীরভাগই প্র্যাকটিক্যাল অর্থাৎ সরাসরি থিয়েটারের মানুষ।
এ ক্ষেত্রে একাডেমীক জায়গার মানুষগুলো কেন সেভাবে থিয়েটারে ঝুঁকছেনা তাও ভাবনার বিষয়। তারা কি শুধুই ডিগ্রী অর্জনের জন্য নাট্যকলার উপর শিক্ষা নিচ্ছে? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। থিয়েটারে তারুণ্যের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বেবী বলেন, আমাদের থিয়েটার চর্চার বর্তমান অবস্থা খুবই সম্ভাবনাময়। কারণ আমরা যখন এদেশে নব নাট্যান্দোলন শুরু করি তখন আমরা তরুণ ছিলাম। এখনও নাট্য চর্চায় তারুণ্যের জাগরণ চলছে।

ঠিক যেমন আমাদের টিভি মিডিয়া তারুণ্যের একটা স্রোতে এগিয়ে চলছে। তার সাথে একই মত পোষন করেছেন নাট্যজন তারিক আনাম খান। থিয়েটার চর্চায় পেশাধারীত্বের প্রশ্নে রোকেয়া রফিক বেবীর বলেন, ১০/১৫ বছর আগে ভাবতাম- আলু-পটল সব ব্যবসাই হচ্ছে কিন্তু কেন আমাদের থিয়েটার একটা কোম্পানী হয়ে উঠছে না।
আসলে আমরা এতেদিন মহিলা সমিতি বা গাইড হাউজ কেন্দ্রিক থিয়েটার করতাম আর এখন শুধু শিল্পকলার ভেতরে থিয়েটার চর্চা করছি। এটাও একটা সিমাবদ্ধতা। তিনি বলেন, তারপরও বলবো আমাদের পেশাদারী নাট্য চর্চার পথ অনেক সুগম। তবে স্বর্ণীল সেই সময়ে পৌঁছাতে আরও অনেক সময় লাগবে।

বেবী বলেন, একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে এসে আবারও উপলব্দি হচ্ছে- আমাদের থিয়েটার চর্চা আরও অনেক বেশী গণমানুষের কা