বিশেষ সংবাদ:

অতীতের কোল বেয়ে আজকের হিমালয়ে আতাউর রহমান

Logoআপডেট: বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

শিহাব ফারুক
তারা তখন শুরু করেছিলেন বলেই আজকের এই ব্যাপ্তিময় পরিসর। তাদের অনবদ্য স্পর্শে সংস্কৃতিতে আলোকিত সন্ধ্যা। মঞ্চ নাটক সংস্কৃতির ক্রমবিকাশে আজকের পরিসরে খুবই জনপ্রিয় একটি বিনোদন মাধ্যম।

জীবনের বহু সর্ণালী সময় বিসর্জন দিয়ে সত্য সুন্দর প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে যারা নিঃস্বার্থক ভাবে থিয়েটার চর্চাকে আজকের জায়গায় আসীন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন নাট্যজন আতাউর রহমান। ব্যক্তিগত জীবনে সদা হাস্য, সরল্য আর নমনীয় সভাবের এই মানুষটি আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিনিয়ত চড়িয়ে যাচ্ছেন আলোকিত প্রতিভার বিকিরণ।

ছেলে বেলা থেকেই নাটকের প্রতি তার একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল। একই ভাবে সঙ্গীতেও। সঙ্গীতের প্রতি ছিল অনেকটা প্রতিবেশী প্রবণতা। “গলায় যেহেতু সুর নেই সেহেতু ভাবলাম নাটকেই কাজ করি। কারণ মানুষ তো শুধু খেয়ে পরে জীবন কাটালে চলে না। সাংস্কৃতিক একটা বিট তো দরকার আছেই। মনের খোরাকের জন্যও তো একটা কিছু বেছে নিতে হবে। তেমনী আগ্রহ থেকেই নাট্যাঙ্গনে অনু প্রবেশ” বললেন নাটকের এই খাটি মানুষ।

রুচিশীল, শিক্ষিত এবং সাংস্কৃতিমনা পরিবার থেকেই তার বেড়ে ওঠা। নিজেদের বাড়ি থেকে নানার বাড়ীর দুরত্ব অল্পখানি। নোয়াখালিস্থ বাড়ী দুটির মনোরম পরিবেশে তার শৈশবের স্মৃতিময় মধুমাখা অতীত শিশু সুলভ মুক্ত হাসির এই মানুষটিকে এখানো ভাবায়। ছোট থেকেই রবিন্দ্র সাহিত্যে খুব বোঝাপড়া। নাটকে তার কাজের সুচনা হয় ষাটের দশকে।

তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সে সময় ২৬শে মার্চ উপলক্ষে ঢাবি’র আজকের শহীদুল্লাহ হল থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন সহ তিনি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন। 'তখন কিন্তু নাটকের জন্য অডিশন হত, বাচাই করে নাট্যকর্মী নেওয়া হত। নির্দেশক হিসেবে তখন থেকেই (ছাত্র থাকাকালীন) আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভালো একটা পরিচিতি ছিল।

মামুন ছিল আবাসিক স্টুডেন্ট এবং আমার এক বছরের সিনিয়র কিন্তু সে ছিল আমার অন্যতম ভাল বন্ধু, হলে তার রুমেই আমাদের নিয়মিত আড্ডা হতো' বললেন আতাউর রহমান। তার অভিনীত প্রথম নাটক আজিম উদ্দিনের “মা”। এই নাটকটিতে তিনি কবি আসাদ চৌধুরীর সাথে অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ আল মামুনের রচনা ও আরিফ হায়দার নির্দেশিত “শপথ” নাটকের মূল চরিত্রে কাজ করে ব্যাপক আলোচিত হন।

৬৮তে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করেছি তেমনী একটা সময়ে একদিন হঠাৎ করেই জিয়া হায়দার এসে থিয়েটার করার প্রস্তাব দেন। তার অনুপ্রেরণাতেই নাটকের দল করলাম। দলের নাম করণ করা হল “নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়”। তখন সাংবাদিক কামাল লোহানীর বাসায় দলের প্রথম সভা করি। এভাবেই শুরু হয় নাগরিকের যাত্রা দৃঢ়স্বরে বললেন আতাউর রহমান।

১৯৭২-এ মাইকেল মধু সূদনের “বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ” দিয়ে তিনি শুরু করেন নির্দেশনা। নাটকটির অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল এই নাটকটির মধ্য দিয়েই ৭২ সালে এদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শন করা হয়। আজ অবদি তার নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা ত্রিশের কোটা ফেরিয়ে। উজ্জল আর ক্লান্তিহীন পথ চলায় এই নাট্যবীর যেন পৌঁছে গেছে অতীতের কোল বেয়ে আজকের হিমালয়ে। তিনি এখন বাংলার মঞ্চাঙ্গনের জনপ্রিয় নির্মাতাদের অন্যতম।

মঞ্চে তার নির্দেশিত প্রতিটি প্রযোজনাই যেন অর্জন করেছে সমতালের জনপ্রিয়তা। তার নির্মিত উল্লেখযোগ্য মঞ্চ নাটকের মধ্যে মাইল পোষ্ট, সাজাহান, কবর দিয়ে দাও, গডোর প্রতিক্ষায়, গ্যালিলিও, ঈর্ষা, হিম্মতি মা, দর্শক চিত্তে এখনো দোলা দেয়। চলতি প্রযোজনা রক্তকরবী এবং অপেক্ষমানে তার অসাধারণ শিল্পকারু ফুটে উঠেছে বিচিত্র মহিমায়।

অভিনয় ও নির্দেশনা দুই জায়গাতেই তিনি সমপ্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন। সু-অভিনয়ের প্রতীক আতাউর রহমান এযাবৎ অভিনয় করতে মঞ্চে উঠেছেন প্রায় বার শতাধীক বার। এক সময় কার নোয়াখাইল্লা হিরো আতাউর রহমান পরবর্তীতে নাটকীয় ভাবেই নিজেকে জড়িয়েছেন টিভি নাটকে।

তার অসাধারণ অভিনয় শৈলীতে তিনি মুগ্ধ করেছেন আমাদের দর্শকদের। শুধু মঞ্চ বা টেলিভিশনে অভিনয় বা নির্দেশনাই নয়, টকশো সহ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন, করে যাচ্ছেনও এই অঙ্গনের অভিভাবকত্বের জায়গায় থেকে।

নবনাট্য আন্দেলন, গ্রুপ থিয়েটার আন্দেলনসহ দেশের সকল সংস্কৃতিক আন্দোলনে আর রয়েছে অসামান্য অবদান। একান্ত মনের টানেই এবং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অসীম ভালবাসার দায় থেকেই তিনি আলোকিত ঝান্ডা হাতে ছুটে চলেছেন আগামীর পথে। তার এ পথ চলা আমাদের সংস্কৃতিকে আরও বেগবান করবে এই প্রত্যাশা সকলের।