বিশেষ সংবাদ:

দ্য টেম্পেস্ট: নতুন নাট্যভাষা নির্মাণ প্রয়াস

Logoআপডেট: শুক্রবার, ০৭ মার্চ, ২০১৪
নাসির উদ্দীন ইউসুফ
মানবজীবনের গভীর অনুভূতির অতুলনীয় কাব্যরূপ, মানব চরিত্রের জটিল গ্রন্থি উন্মোচন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হত্যা, বিপরীতে প্রেম-ভালোবাসা-মমতা। মানবজাতির অনিবার্য এইসব বৈপরীত্য অনায়াসে শেক্সপিয়রের হাতে বিশ্বনাট্যমঞ্চে চিত্রময় হয়ে উঠেছে।
 শেক্সপিয়রকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের আসন। আমি তাঁর নাটকের একনিষ্ঠ পাঠক এবং দর্শক, তা মঞ্চে হোক বা চলচ্চিত্রে। কিন্তু শেক্সপিয়র নির্দেশনার কোনো জোড়ালো অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমি বিগত চারদশক ব্যস্ত থেকেছি প্রয়াত নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নাটক মঞ্চায়ন নিয়ে।
 কখনো কখনো ম্যাকবেথ, লিয়ার, সিজার এসে হানা দিয়েছে। লোভ হয়েছে ওদের হাত ধরে মঞ্চ পরিভ্রমণের। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। যদিও প্রায় দেড়যুগ আগে শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিস মঞ্চায়ন করেছিলাম। কিন্তু তা কখনোই আমার নির্দেশিত নাটক বলে মনে হয় নি।
বাংলার গীতল নাট্য উপস্থাপনা এবং অভিনয়রীতির ঐতিহ্যবাহী প্রয়োগ কৌশল আত্মস্থ করে সেলিম আল দীন ঔপনিবেশিক অবলেশমুক্ত যে আধুনিক বাংলা নাট্যরীতির উদ্ভাবন ঘটান তার চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছি বিগত চারদশক। সেলিম আল দীনের আত্মউপলব্ধির আলোয় ঢাকা থিয়েটার এবং গ্রাম থিয়েটারকে নিয়ে, বাংলার নিজস্ব নাট্যরীতি, অভিনয়রীতির প্রয়োগ প্রয়াস আমার প্রায় সকল নির্দেশিত নাটকে প্রতীয়মান হলেও মার্চেন্ট অব ভেনিস -এ তা অনুপস্থিত। হয়তো আমাদের দেশে শেক্সপিয়রের প্রচলিত ধারার প্রযোজনাসমূহ আমাকে দ্বিধান্বিত করেছিল ওই নাটককে বাংলারীতির শরীরে সন্নিবেশিত করতে।
যা হোক, যখন শেক্সপিয়রের গ্লোব থিয়েটার থেকে আমন্ত্রণ এলো দ্য টেম্পেস্ট করার জন্য ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে, তখন একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম। ইমোজেন বাটলার-কোল ইংল্যান্ডের নাট্যনির্দেশক। সে আমার কন্যা এশার বন্ধু। ইমোজেন গ্লোবের সাথে আমাদের যোগসূত্র। লন্ডনের শেক্সপিয়রের গ্লোব থিয়েটার বিশ্বের নাট্যকর্মীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। গ্লোব থিয়েটার আয়োজিত এই বিশাল উৎসবে আমন্ত্রণ পাওয়া গৌরবের ব্যাপার। শেক্সপিয়রের ৩৭টি নাটক, ৩৭টি ভাষায় ৩৭টি দল বিশ্ব অলিম্পিকের পাশাপাশি গ্লোব থিয়েটারে মঞ্চায়িত হবে। বাংলা ভাষায় ঢাকা থিয়েটারের জন্য নির্ধারিত হলো দ্য টেম্পেস্ট । সংবাদটি গৌরবের তবে আতঙ্কেরও বটে। সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করা ৩৭টি দল এবং নির্দেশক হওয়া গৌরবের কিন্তু শেক্সপিয়র তো আমার আয়াসসাধ্য নয়। আর আমার নাট্যভাবনা এবং প্রয়োগরীতিতে আদৌ দ্য টেম্পেস্ট এর মঞ্চরূপ সম্ভব কিনা তাতেও সংশয়াকুল ছিলাম। কেননা আমি তো ভিনদেশী আঙ্গিক বা রীতিতে দ্য টেম্পেস্ট মঞ্চায়ন করবো না। কিন্তু কথা তো দিয়ে ফেলেছি, তাই নিরূপায় হয়ে নাট্যকর্মের প্রাথমিক কাজে মনোযোগী হলাম। রুবাইয়াৎ আহমেদকে অনুবাদ করার দায়িত্ব দেওয়া হলো নির্দিষ্ট রীতিতে, তা হলো ‘পালাগান’ এর আঙ্গিক। শিমূল ইউসুফ সহযোগী নির্দেশক, সঙ্গীত ও পোশাকের দায়িত্ব নিল। প্রথম অনুবাদ কর্ম শেষ হলো ২০১১ সালের নভেম্বরে। কিন্তু শেক্সপিয়রের বিশাল পটভূমির দ্য টেম্পেস্ট  ভিন্ন ভাষাভাষী দর্শকের জন্য বাংলার ঐতিহ্যবাসী নাট্যাঙ্গিক পালাগানের রীতিতে দুর্বোধ্য হয়ে উঠতেও পারে। এই দ্বিধাকে মাথায় রেখে অতঃপর দ্বিতীয় দফায় সেই অনুবাদের ওপর নির্ভর করে রুবাইয়াৎ ও শিমূল দীর্ঘ দিবসরাত্রি পরিশ্রম করে ‘নব্যপাঁচালি’ আঙ্গিকে নাটকটির নতুন একটি চেহারা দাঁড় করালো। কিন্তু কোন সেই পরিবেশনা আঙ্গিক যা ধারণ করবে তাল, লয়, ছন্দ, চলন, বলনে ভিন্ন ভাষার একটি নাটক। আমার দীর্ঘদিনের অভিযাত্রায় আকাক্সক্ষা ছিল মনিপুরী নটপালা আঙ্গিকে বা সেই আঙ্গিকের আলোকে একটি নাটক তৈরি করা। যদিও বাংলার অন্যান্য রীতি ও আঙ্গিকে আমার সিংহভাগ নাটক মূর্ত হয়েছে। ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা সমূহে আমাদের দেশের ভৌগলিক সীমারেখায় বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিসত্তা এবং নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতিও উঠে এসেছে আপন অধিকারে। প্রযোজনা প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়ে আমি এবং শিমূল এ সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, মনিপুরী নটপালা রীতির সফল প্রয়োগ এবং বাঙলির পাঁচালির গঠনরীতির সংমিশ্রণে একটি নতুন নাট্যভাষা তৈরি করে দ্য টেম্পেস্ট’র প্রযোজনা সম্ভব।
মনিপুরী সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের যোগাযোগ একযুগেরও অধিক। মনিপুরী নৃত্যশিল্পী নীলমনি সিনহা ও বিধান সিনহাকে আমন্ত্রণ জানাই আমাদের ঢাকা থিয়েটারের কর্মীদের সাথে এসে কাজ করতে। নীলমনি দলের অভিনেতাদের নিয়ে দীর্ঘ ৬ মাস ধরে মনিপুরী নৃত্য এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়ে কর্মশালা করছে। নির্দেশনার কাজও এরই মাঝে প্রতিদিন নিয়মিত চলেছে। একেবারেই অজানা পথে হাঁটা। নির্দিষ্ট জাতি ও নৃগোষ্ঠীর শিল্পরীতি, আঙ্গিক এবং নন্দনতত্ত্ব গড়ে ওঠে তার জীবনযাপন এবং বিশ্বাসের উপর। আমরা যারা বাঙালি তারাতো ভিন্ন জীবনযাপন আর বিশ্বাসে বেড়ে উঠেছি। তাই জন্মের মধ্যদিয়ে যে সাংস্কৃতির উত্তরাধিকারে একটি জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে তা ভিন্ন জাতিসত্তার পক্ষে তাৎক্ষণিক গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিদিন টেম্পেস্টের ঘটনা, চরিত্রসমূহের সাথে বোঝাপড়া, নির্দেশনার অজানা রীতি ও ভাষার সন্ধানে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৪০ বছরের চর্চায় বিদেশি নাট্যতাত্ত্বিক এবং দেশজ ঐতিহ্যবাহী নাট্যতত্ত্বের আলোকে আমার নিজস্ব একটি নির্দেশনারীতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি সন্ধান করছি নতুন একটি নাট্যভাষার, যা সম্পূর্ণভাবে আমাদের দেশজ ঐহিত্যবাহী নাট্য, নৃত্য, সঙ্গীত, কাব্যরীতির অভিজ্ঞতায় নির্মিত কিন্তু একই সাথে আন্তর্জাতিক, পৃথিবীর সকল ভাষাভাষী সংস্কৃতির মানুষের কাছে বোধগম্য নাট্যভাষা। অবশ্যই বিদেশি নাট্যতাত্ত্বিক এবং নাট্যবিদরা বহুপূর্বে তাদের ঐতিহ্যআশ্রিত নাট্যভাষা নির্মাণ করেছেন যা আন্তর্জাতিক।
দ্য টেম্পেস্ট বিষয় বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বা শাশ্বত কিন্তু আঙ্গিক এবং রীতি সম্পূর্ণ ইউরোপীয়। শেক্সপিয়রের প্রায় সকল নাটকের বিষয় মানবজীবনের অন্তর্গত সত্যের বিস্ময়কর উন্মোচন এবং তা জাতি, ধর্ম, কাল ভেদে আন্তর্জাতিক। শেক্সপিয়র প্রিয় কিন্তু অত্যন্ত কঠিন কাঠামোর আঁটসাট তার গড়ন। সেই শক্ত কাঠামো ভেদ করে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকের অভিজ্ঞতায় নতুন নাট্যভাষায় তাঁর নাটক মঞ্চে পুনর্নির্মাণ প্রায় দুঃসাধ্য। তবুও যখন বিশ্ব নাট্যোৎসবে বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের ঢাকা থিয়েটার দ্য টেম্পেস্ট মঞ্চায়ন করবে, তাই সকল বাধা অতিক্রম করে আমাদের মহড়াকক্ষে প্রায় প্রতিমুহূর্তে নতুন নাট্যভাষা আবিষ্কার এবং প্রয়োগ এই প্রক্রিয়া চললো দিনের পর দিন। ধীরে ধীরে আমরা লক্ষ করলাম, শেক্সপিয়রের দ্য টেম্পেস্ট বাংলা নাট্যরীতি এবং প্রয়োগে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে দৃশ্যমান হতে থাকলো।
বিষয়ের দিক থেকে দ্য টেম্পেস্ট শেক্সপিয়রের অন্য নাটকগুলো থেকে বেশ ভিন্ন চরিত্রের। শেক্সপিয়রের নাটকে হত্যা অবধারিত কিন্তু এই নাটকে তা অনুপস্থিত। বিস্ময়করভাবে চারশ’ বছরেরও অধিককাল আগে শেক্সপিয়র ব্রিটিশ উপনিবেশের নিপীড়ন-নির্যাতন উপলব্ধি করেছিলেন এবং অত্যন্ত সাহসের সাথে তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ নাটক দ্য টেম্পেস্ট -এ প্রকাশও করেছেন। শৃঙ্খলিত জাতি-মানুষের বেদনা, কষ্ট, ঘৃণা উপলব্ধি করেছিলেন। যদিও ক্যালিবান চরিত্র পরিচিতিতে তিনি ‘সেভেজ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। হয়তো এটি রাজরোষ থেকে রেহাই পেতে কৌশলও হতে পারে। আমার নির্দেশনার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিকতার শিকার মানুষের ক্ষোভ-সংগ্রামকে সম্যক উদ্ভাসন করা। সেলিম আল দীনের ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ তত্ত্বের আলোকে তা করার প্রয়াস নিয়েছি। নৃত্য, গীত, সংলাপ, অভিনয় সবকিছুর আলাদা অস্তিত্ব মান্য করে অভিন্ন এক শিল্পরূপ খোঁজার চেষ্টা রয়েছে আমার এ নির্দেশনায়।
এ প্রযোজনায় আমি যুগপৎ বিস্ময় এবং আনন্দের সাথে প্রত্যক্ষ করেছি, ঐতিহ্যবাসী বাংলা নাট্যরীতির গ্রহণক্ষমতা দেখে। শেক্সপিয়রের মত মহৎ কবি এবং নাট্যকারের শক্ত গাঁথুনির পঞ্চাঙ্কের নাটককে অনায়াসে আমাদের নাট্যরীতি ও ভাষায় মঞ্চায়ন সম্ভব। শিল্পী ঢালী আল মামুনের শিল্প নির্দেশনা আমার চিত্রপটকে সমৃদ্ধ করেছে। শিমূল ইউসুফ, নীলমনি সিনহা এবং বিধান সিনহার কোরিওগ্রাফ, শিমূলের সুর এবং পোশাক আমার নতুন নাট্যভাষা প্রয়োগের প্রধান উপাত্ত হিসেবে আমাকে দুঃসাহসী করেছে।
ঢাকা থিয়েটারের পরিশ্রমী মঞ্চকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমে অবশেষে দ্য টেম্পেস্ট মঞ্চের আলোয় নৃত্যপর হয়ে উঠবে। আমি অবশ্যই মনে করি না দ্য টেম্পেস্ট অত্যন্ত সুপ্রযোজনা হিসেবে আদৃত হবে, কিন্তু এটি যে ভিন্ন নাট্যভাষার, ভিন্ন আঙ্গিক ও রীতির প্রয়োগে একটি ভিন্নধর্মী প্রযোজনা তা দর্শকমাত্রই স্বীকার করবেন। এ নাট্যপ্রযোজনা যদি নতুন নাট্যনির্দেশক, অভিনয়শিল্পীদের নতুন ভাবনার দ্বার খুলে দেয় তবেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।
এই নাটকটি মঞ্চায়নে গ্লোব থিয়েটারের ভূমিকাই মুখ্য। এই সুযোগ দেওয়ার তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এই প্রযোজনায় অনুদান দিয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তাদের প্রতি। নানাভাবে সহায়তা করেছে কারিগর ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজিস লি.। তাদের প্রতিও ঋণ স্বীকার করছি। বাংলাদেশের সকল সংস্কৃতিকর্মীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় আমি সিক্ত চিরদিন। তোমাদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ।