বিশেষ সংবাদ:

রবীন্দ্র-সেলিমের বেশে শেক্সপিয়রের দেশে

Logoআপডেট: শুক্রবার, ০৭ মার্চ, ২০১৪
ড. রুবাইয়াৎ আহমেদ
বিশ্বখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র প্রতিষ্ঠিত গ্লোব থিয়েটারে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায়  কোনো নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছে। আর এই অসামান্য গৌরবের অংশ ঢাকা থিয়েটার। গ্লোব থিয়েটারের মঞ্চে ঝংকৃত হবে শেক্সপিয়রের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ নাটক দ্য টেম্পেস্ট।
 বাংলা ভাষী ও বাঙালির জন্যও এ এক বিশেষ ঘটনা। আমার অশেষ ভাগ্য, এই প্রযোজনায় কালজয়ী নাট্যকার শেক্সপিয়রের দ্য টেম্পেস্ট বাংলা ভাষায় অনূদিত ও রূপান্তরিত হয়েছে আমারই হাত দিয়ে। এই বিরল সুযোগ আমাতে ন্যস্ত করার জন্য দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
হাজার বছর ধরে এই ভূখন্ডের কবিগণ তাঁদের নাট্যমূলক ক্রিয়া পরিবেশন করে আসছেন পাঁচালি নামক এক বিশেষ শিল্পাঙ্গিকের মাধ্যমে। আধুনিক সময়ে নাট্যচার্য সেলিম আল দীন সেই ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিককে পুনর্নির্মাণ করেন। আমিও অগ্রসর হয়েছি সেই পথেই। দ্য টেম্পেস্ট  নাটকটিকে বিন্যস্ত করেছি পাঁচালির সার্বভৌম আঙ্গিকে, যাকে আমরা চিহ্নিত করি নব্যপাঁচালি অভিধায়। এ ক্ষেত্রে আমার বিবেচনা এই যে, বাঙলা ঐতিহ্যবাহী নাট্যাঙ্গিকের সেই শক্তি রয়েছে, যেকোনো শিল্পকে যা আত্মস্থ করতে সক্ষম। দ্য টেম্পেস্ট’র অনুবাদ ও রূপান্তরে সেই বিশ্বাসলব্ধ নীরিক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে।
পাশাপাশি নাটকটির বাঙলায়ন চলাকালীন দেশ, কাল ও সংস্কৃতির ইশারা নিয়ত ঘূর্ণায়মান ছিল আমার প্রতিবেশে। দেশের ক্ষমতা কাঠামোয় অংশীদারিত্বের জন্য চর্চিত অপরিমেয় কূটচাল, আমাদের মননে প্রবিষ্ট করে দেওয়া ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আধিপত্য ইত্যকার বিষয়গুলো গ্রন্থিত করেছি সচেতন পারম্পর্যে। পরিহার করেছি পাশ্চাত্যের অঙ্ক-দৃশ্য বিভাজনের ধারা। এমন অনেক অনুষঙ্গই এতে অঙ্গীকৃত হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ উন্মোচন শেক্সপিয়রে নাই, কিন্তু দূরবর্তী আভাসই এই নাট্যে আভাময় হয়েছে শিল্পের নান্দনিক কৌশলে। ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন ভূগোলের স্বাধীন শিল্পী হিসেবে সেই অধিকার তো আমি গ্রহণ করতেই পারি। আশা রাখি, কোথাও তা পৃথক অস্থিত্ব নিয়ে তুলবে না বেসুরো আওয়াজ। বাংলাভাষায় এ জাতীয় প্রচেষ্টার দ্বিতীয় উদাহরণ জানা নাই। গীত, সঙ্গীত, কাব্য, সংলাপ, বর্ণনা ও নৃত্যকে একাঙ্গে ধারণ করে পাঁচালির যে অদ্বৈতরূপ, ঢাকা থিয়েটারের দ্য টেম্পেস্ট সেই পরম্পরানিষ্ঠ মঞ্চরূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকের মঞ্চায়নে যে নিরাভরণতার আশ্রয়ী, দৃশ্যনির্মাণে দর্শকের কল্পনাশক্তিতে তাঁর যে আস্থা, সেলিম আল দীন আত্মসৃষ্টিতে যে দ্বৈতাদ্বৈতবাদে স্থিত, আমার অনুবাদ-রূপান্তর ও ঢাকা থিয়েটারের পরিবেশনাতেও সেই অমর্ত্যমানবদ্বয়ের প্রেরণাই ক্রিয়াশীল। এই নাট্য তাই রবীন্দ্র-সেলিমের বেশে যাবে শেক্সপিয়রের দেশে।
প্রায় একযুগ ধরে লালিত আমার একটি স্বপ্ন, বাংলানাট্যের সুবর্ণপুত্র নাসির উদ্দীন ইউসুফের হাত ধরে মঞ্চে মূর্ত হবে আমারই কোনো রচনা। তাঁরই জিয়নকাঠির স্পর্শে মঞ্চে মূর্ত হবে অক্ষরে বিন্যস্ত মানব-মানবীগণের অবয়ব। আজ তাই বাস্তবায়িত হলো। তাঁর প্রতি প্রণত হই। যদিও পূর্ণ অর্থে নয়, তবু রূপান্তরের উজান ঠেলে শূন্য ক্রোড়ে ঠাঁই নিয়েছে যে শিল্পসন্তান, সে তো আমারই।
মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফের প্রত্যক্ষ উপদেশ ও সহযোগিতা ছাড়া এই কর্ম সম্পাদন দূরূহ হতো নিঃসন্দেহে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা। এই প্রযোজনায় অংশগ্রহণকারী ও সহযোগী সবার প্রতি ভালোবাসা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় নাটক পালন করেছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নাট্যচর্চাকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে নাটকের দলগুলো। আজ দেশে নাট্যচর্চায় নিবেদিত শত শত নাট্যদল। সৃজিত হচ্ছে উন্নতমানের শিল্প। সকলের মিলিত প্রচেষ্টাতেই বাংলানাট্য আজ বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে ঝংকৃত হচ্ছে। এ কারণে শেক্সপিয়রের দেশে ঢাকা থিয়েটারের এই অভিযাত্রা শুধুমাত্র একটি নাট্যদলের একার যাত্রা নয়, বাংলাদেশের যাত্রা, সমগ্র বাংলানাট্যের যাত্রা। নিরন্তর বাংলানাট্যের শাশ্বত সুরের প্রতি আহ্বান জানাই সবাইকে।