বিশেষ সংবাদ:

থিয়েটারে আমাদের প্রথম প্রতি বন্ধকতা হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব : রোকেয়া রফিক বেবী

Logoআপডেট: শুক্রবার, ০৪ জুলাই, ২০১৪

আমাদের থিয়েটার চর্চা মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী একটা মুক্তধারায় প্রবাহিত হয়েছে। এরই মধ্যে কখনো রাষ্ট্রিয়, কখনো ধর্মীয় আবার কখনোবা সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা নাটকের স্বাতন্ত্রিক গতিকে ব্যাহত করেছে।

বহু জলাঞ্জলীর পথ ফেরিয়ে তবুও আমাদের নাটক এগিয়েছে বহুদূর। বর্তমান সময়ে আমাদের নাটকের প্রকাশভঙ্গি, অভিনয় কৌশল, শিল্পগুণের বিচার, সমস্যা-সম্ভাবনা তথা অগ্রগতি এমনকি বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে আমার বিনোদনের মুখোমুখি হয়েছেন দেশের গুণী নাট্যনির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী। জানাচ্ছেন- ফারুক হোসেন শিহাব।

ব-নাট্যান্দেলনের বিপ্লবী নটযোদ্ধা রোকেয়া রফিক বেবী। দেশের থিয়েটার চর্চাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসতে যাদের নিরন্তন প্রচেষ্টা ছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আমাদের নাটকের আগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতা পরবর্তী বিগত চার দশকেরও বেশী সময় ধরে আমরা পরিচ্ছন্ন নাট্যচর্চা করে আসছি। এর মধ্যে অনেক চরায়-উৎরায় পার হয়েছে।

এ পর্যায়ে এসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মাধ্যমে জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটতে ব্যার্থ হলেও আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তথা নাট্যাঙ্গন জাতিকে মোটেও নিরাস করেনি। বরং দেশের মঞ্চ ও টিভি মিডিয়া স্বাতন্ত্রিক নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক রুচিবোধকে এক অনবদ্য চূড়োয় আসীন করেছে। বিশেষ করে বিশ্বস্থতার  সাথেই আমাদের থিয়েটার অঙ্গন বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাথে তাল রেখে আমাদের নাটকে বৈচিত্রতা ও বহুমাতৃকতার বিষয়ে রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, একটা সময় আমরা বিদেশী নাট্যকারদের নাটকের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের দেশীয় নাট্যকার বা পান্ডুলীপি সংকট নেই বললেই চলে। ব্যাপক অর্থে আমি কিন্তু দেশী-বিদেশী নাটককে আলাদাভাবে দেখিনা, আমি দেখি একটা নাটকের কন্টেন্ট কি? এর মধ্যে কতোখানি বৈচিত্রতা, বহুমাতৃকতা এমনকি শিল্পবোধ রয়েছে। এতে কতটা সময়ের দাবি রাখে। সে অর্থে বর্তমানে আমাদের নাট্যমান অনেকাংশে সমৃদ্ধ।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী কোলকাতায় যে নাট্য চর্চা হচ্ছে সে তুলনায় বাংলাদেশের নাটক অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে দু’দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ে এটাই উপনীত হয়। অবশ্য আমাদের দেশে ভারতের যেসব নাটক নিয়ে আসা হয় তার মধ্যে দেখা যায় সে দেশের অনেক ভালো নাট্যদল বা নাট্য প্রযোজনাই সুযোগ পায় না। আবার আমাদের দেশ থেকে যেসব নাট্যদল বা নাটক ভারত কিংবা অন্যান্য দেশে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্য যায় সে ক্ষেত্রেও অনেক ভালো দল বা নাটক সুযোগ পায় না। যদিও আন্তর্জাতীক ক্ষেত্রে এ জায়গাটি আরও পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত।
নাট্য চর্চায় প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনার প্রশ্নে বেবী বলেন, বহিঃবিশ্বের থিয়েটারের তুলনায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছি। প্রশ্ন হলো কেন আমরা পিছিয়ে? এখানে প্রতিবন্ধকতা কোথায়? আমাদের প্রথম প্রতি বন্ধকতা হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। তারপর সময় সীমাবদ্ধতা, ধর্মীয় গোড়ামী, ইত্যাদি-ইত্যাদি। তারপরও শুধুমাত্র ইভিনিং থিয়েটার চর্চা করে এবং নাট্যকর্মীদের পকেটের পয়সায় আমাদের থিয়েটার যে পর্যায়ে এসেছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, থিয়েটার হচ্ছে সত্যিকারের ভালোবাসার জায়গা। এখানে শিল্পের প্রতি নিরেট প্রেম থাকা চাই। কোনভাবেই এর বিকল্প নেই।
রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, আমাদের নাটক সংশ্লিষ্ট দল বা মানুষগুলো যদি অন্য দেশের ন্যায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেতো, যথার্থ প্রশিক্ষণ পেতো নিঃদ্বিধায় যদি পেশাদারী নাট্য চর্চা করতে পারতো, আমাদের একজন ডিজাইনার, অভিনেতা বা নির্দেশক যদি আরো অনেক সময় দিতে পারতো, আরো অনেক ভাবতে পারতো তাহলে আমরা আরও অনেক বেশী এগিয়ে যেতাম। তিনি বলেন, আমাদের নাট্য শিক্ষার দুটি জায়গা একাডেমীক এবং প্যাকটিক্যাল। এখানে আমাদের নাট্যঙ্গনকে যারা সরব রেখেছে তাদের বেশীরভাগই প্যাকটিক্যাল অর্থাৎ সরাসরি থিয়েটারের মানুষ।

এক্ষেত্রে একাডেমীক জায়গার মানুষগুলো কেন সেভাবে থিয়েটারে ঝুঁকছেনা তাও ভাবনার বিষয়। তারা কি শুধুই ডিগ্রি জন্য নাট্যকলার উপর শিক্ষা নিচ্ছে? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। থিয়েটারে তারুণ্যের কার্যক্রম সম্পর্কে বেবী বলেন, আমাদের থিয়েটার চর্চার বর্তমান অবস্থা খুবই সম্ভাবনাময়। কারণ আমরা যখন এদেশে নব নাট্যান্দোলন শুরু করি তখন আমরা তরুণ ছিলাম। এখনও নাট্য চর্চায় তারুণ্যের জাগরণ চলছে। ঠিক যেমন আমাদের টিভি মিডিয়া তারুণ্যের একটা স্রোতে এগিয়ে চলছে। থিয়েটার চর্চায় পেশাধারীত্বের প্রশ্নে রোকেয়া রফিক বেবীর বলেন, ১০/১৫ বছর আগে ভাবতাম- আলু-পটল সব ব্যবসাই হচ্ছে কিন্তু কেন আমাদের থিয়েটার একটা কোম্পানী হয়ে উঠছে না। আসলে আমরা এতেদিন মহিলা সমিতি বা গাইড হাউজ কেন্দ্রিক থিয়েটার করতাম আর এখন শুধু শিল্পকলার ভেতরে থিয়েটার চর্চা করছি। তিনি বলেন, তারপরও বলবো আমাদের পেশাদারী নাট্য চর্চার পথ অনেক সুগম।

তবে স্বর্ণীল সেই সময়ে পৌঁছাতে আরও অনেক সময় লাগবে। বেবী বলেন, একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে এসে আবারও উপলব্দি হচ্ছে- আমাদের থিয়েটার চর্চা আরও অনেক বেশী গণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। যত দ্রুত সম্ভব তা করতে হবে। তবেই এদেশে রেপাটরী থিয়েটার চর্চা আপন মহিমায় দাঁড়াবে। আমরা কিন্তু বিষয়টিকে একটা চ্যালেঞ্চের মুখোমুখি নিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে আমাদের নাট্য নির্মাতাসহ সংশ্লিষ্টদের অনেক বেশী আন্তরিক হতে হবে।

মঞ্চ ও টিভি মিডিয়ায় নির্মাতাদের দৈন্যতা ও এ থেকে উত্তরণ সম্পর্কে রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, একজন অভিনেতাকে একজন নির্দেশককে অনেক বেশী প্রস্তুত হতে হবে, অনেক জানতে হবে, ভাবতে হবে, জীবনবোধের খুবই কাছাকাছি যেতে হবে। সরকারকেও এর জন্য পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য ইন্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। দলগতভাবে আরও বেশী বেশী কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, টেলিভিশনে অনেক তরুণ নির্মাতাই হাত ঘষতে-ঘষতেই পরিচালক বনে গেছেন যা শিল্পের জায়গাটাকে বিচ্যুত করেছে। তাদেরকে প্রযোজনার সংখ্যা না দেখে গুণগত মানের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য আহ্বান করবো। নিজের ভাবনার জায়গাটাকে স্থির রেখে সর্বস্তরের দর্শকদের হৃদয়গ্রাহী প্রযোজনা নিয়ে আসতে হবে। তা-না হলে আমাদের সংস্কৃতির এ মাধ্যমটিও আরও সংকটে পতিত হবে।