বিশেষ সংবাদ:

মঞ্চ নাটকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

Logoআপডেট: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
নাট্যবোদ্ধাদের মতানুসারে সাতশ’ বছরের বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসের ক্রমবিকাশে দুইশ’ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করল বাংলা নাটক।

 

মঞ্চনাটক স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে যতটা এগিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। নাটকের রূপরেখায় ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে। সেই ঐতিহ্যে উদ্ভুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মঞ্চনাটক দাঁড়ালো মাথা উঁচিয়ে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে অর্ধশতাধিক নাটক রচিত হয়েছে।

 

এসব নাটকে স্থান পেয়েছে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ, পাকদের হাতে নারী ধর্ষণ, ধর্ষিত ও নির্যাতিতদের আর্তনাদ, বাঙালির অকুতোভয় অবিরাম পথ চলা আর বিরত্ব গাঁথা বিজয় এমনকি রাজাকার, আলবদর, আলশামস তথা পাক নর-পশুদের অমানবিক নিষ্ঠুরতার লোমহর্ষক নানা চিত্র। কারারুদ্ধ অবস্থায় একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী নাট্যজন মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন অনবদ্য নাটক ‘কবর’।

 

শুধু কবরই নয় স্বাধীনতা পূর্বসময়ের প্রতিবাদমুখী বহু নাটক যুদ্ধকালীন সময়েও বাঙালীকে উৎসাহ যুগিয়েছে। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই নতুন দেশের মঞ্চে আমাদের নাটক প্রাণ পায়। বিশেষ করে মুক্তির চেতনায় বিপ্লবী কথোপকথনে নির্মিত পথনাটকও জাতীকে উদ্দীপ্ত করে। দেশী নাট্যকারদের পাশাপাশি স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে ও পরে আমাদের নাট্যকাররা বিদেশী বহু নাট্যকারের বিপ্লবী নাটক অনুবাদ ও রূপান্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে এসব নাটক মুক্তিরস্বপ্নে বিভোর বাঙালিদের উজ্জিবীত করেছে।

 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রুদ্ধ সময়ের নাটকে ভেসে ওঠে স্বাধীনতা চেতনার প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বনে সবচেয়ে মঞ্চ সফল ও আলোচিত নাটক লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। তার কাব্য নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ বাংলার সর্বমহলে আলোচনার ঝড় তোলে। এছাড়াও তিনি লিখেছেন ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ ও ‘এখানে এখন’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক ও বিষয়াবলি নিয়ে যেসব নাট্যকার নাটক লিখেছেন তাদের মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য হচ্ছেন- সাঈদ আহমেদ, আল মনসুর, রণেশ দাষ গুপ্ত, পঙ্কজ বিভাস, এসএম সোলায়মান, জিয়া হায়দার, আলাউদ্দিন আল আজাদ, নিলীমা ইব্রাহীম, নুরুল আম্বিয়া, কল্যাণ মিত্র প্রমূখ।


এসব নাট্যকাররা তাদের নাটকে মুক্তিযুদ্ধের যে খ-চিত্র, অনুষঙ্গ বা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ বর্ণীল শিল্পরসে অংকন করেছেন তা আজ কালের সাক্ষী। পরবর্তীতে প্রয়াত সেলিম আল দীন, আবদুল্ল¬াহ আল মামুন ও মান্নান হীরা, মামুনুর রশীদ, ড. ইনামুল হক মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লিখেছেন অসংখ্য নাটক। ফাল্গুনী হামিদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ কুমার প্রীতিশ বলের বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক বাংলাদেশের নাট্যোঙ্গনে যোগ করেছে দেশপ্রেমের একটি স্বাতন্ত্র মাত্রা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তখনকার বহু নাট্যকর্মী।

 

যাঁদের মধ্যে অন্যতম- মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, ম. হামিদ, পিযূস বন্দোপাধ্যায়ের মতো রণাঙ্গনে অংশ নেওয়া বহু লড়াকু সৈনিক। তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের হয়ে কাজ করেছেন কলিম শরাফী, রনেশ দাস গুপ্ত, সৈয়দ হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদারসহ বহু নাট্যযোদ্ধা। মঞ্চের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছে বহু পথনাটক। অবশ্য, ব্যাপক অর্থে প্রথমদিকে পথনাটক ও বেশ কিছু মঞ্চনাটক জাতিকে দেশত্ববোধের চেতনা যেভাবে আন্দেলিত করেছে- পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যপ্রয়াস সেভাবে আশানুরূপ প্রভাব পেলতে পারেনি। অবশ্য, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিবাদী নাটকের ক্ষেত্রে সম্প্রতি মান্নান হীরা রচিত ‘লালজমিন’ মামুনুর রশিদ’র ‘টার্গেট প্লাটুন’ ও ‘ভঙ্গবঙ্গ’ বাবুল বিশ্বাসের ‘পোড়ামাটি’ নাট্যাঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।

 

এছাড়া বিভিন্ন নাটকে নানাভাবে উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা দেশত্ববোধের অপারচেতনা। স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা ৪০ চার দশককে স্বরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শতাধিক নাটক নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে আয়োজন করে দেশের সর্ববৃহৎ ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয় নাট্যোৎসব’। আয়োজনটির মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমগ্র দেশ যেন মেতে উঠে নাটকের আনন্দযজ্ঞে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এরইমধ্যে সারাদেশে রচিত হয়েছে স্বদেশপ্রেমের বেশ কিছু মঞ্চ ও পথনাটক।

 

কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে তা অপ্রতুল। তাছাড়া এসব নাটক বেশীরভাগই মঞ্চায়নের মুখ দেখেনি। একই সাথে পুঁজিবাদের গেঁড়াকলে যেন আমাদের মেধাগুলো লেপটে পড়ছে, মঞ্চের পান্ডুলিপির চাইতে আমাদের বেশীরভাগ নাট্যকার জীবন-যাত্রার মাত্রা ঠিক রাখতে টিভিমিডিয়ার কাজে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। যা মোটেও ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না। এতে করে আমাদের মঞ্চাঙ্গন এখন চরম পান্ডুলিপি সংকটে ভূগছে।

 

এর থেকে পরিত্রানের জন্য সংশ্লিষ্টদেরই এগিয়ে আসতে হবে। একই সাথে নাটকের অবিভাবক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে যথার্থ উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিশেষে নিঃসন্দেহে বলা যায়- মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ফসল হচ্ছে আজকের বাংলা নাটক তথা মঞ্চ নাটকের ব্যাপ্তি। হাজার ঘটনার রূপকল্প আমাদের মন থেকে অনবরত মুছে যাবে, ছিঁড়ে পড়বে জীবনের পাতা থেকে কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার চেতনা মহান মুক্তিযুদ্ধ বার বার আমদের জাগিয়ে তুলবে।