বিশেষ সংবাদ:

মন মাতানো ছেলেবেলার সেই খেলাগুলো

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৫

-আপন দে অপু
কালের গর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে শিশু কিশোরদের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো। যে খেলাগুলো ছিল আমাদের শৈশব কৈশরের প্রাণের স্পন্ধন। সেগুলো আজ বিলিন হয়ে গেছে।

 

হয়তো হাজারো পাওয়ারের লাইট জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বিশেষ করে শীতকালই ছিল এই খেলা গুলোর জন্য উৎকৃষ্ট সময়।

 

হৃদয়ে দোলা জাগানো, প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সম্পন্ন হওয়া সেই খেলা গুলো সম্পর্কে আজকের শিশুরা মেটেই ধারনা রাখেনা। প্রযুক্তি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে এই সব খেলাগুলোকে। প্রযুক্তি শিশুদেরকে ক্রমান্নয়ে যান্ত্রিক মানুষে পরিনত করছে।

 

আগে আমরা স্কুল বিরতির সময়, বাড়িতে সকালে-বিকেলে, অবসর পেলেই মেতে উঠতাম ঐতিহ্যবাহী সেই খেলা গুলোয়। আর এখন ক্রিকেট আর ফুটবল দখল করে নিয়েছে সেই স্থান। প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি হয়ে প্রকৃতির সাথে আলিঙ্গনের একমাত্র পথ এই গ্রামীন খেলা গুলো। আজ বিদেশী খেলা ক্রিকেট আর ফুটবলের দৌরাত্যে নিতান্তই অসহায় গ্রামীণ খেলাগুলো। আগে শীত কাল মানেই ছিল গ্রামের প্রতিটি খোলা মাঠে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের হৈ হুল্লো, চেঁচামেচি। এখন তা চোখে পড়েনা। এখন শীতকাল মানেই বিদেশী রাজকীয় খেলা ব্যাডমিন্টন। অথচ কতইনা মজার ছিল গ্রামীণ খেলাগুলো। আজকালকের শিশুরা দুটি গ্রামীণ খেলার নাম বলতে পারবে কিনা আমার সন্ধেহ হয়। আমাদের কর্তব্য শিশুদেরকে সেই সব খেলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নাহয় পুরো বাংলার ইতিহাস থেকেই মুছে যাবে এই সব ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর নাম। 

 

গোল্লাছুট :
এই খেলাটাকে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এই খেলায় খেলোয়াড় সংখ্যা নিয়ে কোন সমস্যা নয়। দুই পক্ষের খেলোয়াড় সংখ্যা সমান হলেই হয়। এই খেলাটা শীতকালেই বেশি হয়। তখন খালি থাকে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। ধানকাটার পর খালি হওয়া মাঠেই এই খেলা হয়ে থাকে। প্রথমে একটা গোল্লা ঠিক করা হয়। গোল্লা থেকে বেশ খানিক দুরে দেওয়া হয় গদির সীমানা। গোল্লার ভিতরে থাকে টসে বিজয়ী দল। এদের মধ্যে একজন থাকে রাজা। রাজা থাকে সবার শেষে। দলের সবাই রাজার হাত ধরে শিকল তৈরী করে রাজার চার পাশে প্রথমেই একবার ঘুরে। এবং ছড়া কাটে “রাজার বাড়ির হাদার গেল্লা ছুটেরে” বলে। এই শিকল থেকে যদি প্রতিপক্ষের কাউকে স্পর্ষ করা যায় তবে সে বাদ যায় খেলা থেকে। গোল্লা থেকে দৌরে গিয়ে সীমানা ছোঁয়াই থাকে লক্ষ্য। একজন খেলোয়াড় সীমানা প্রাচীর স্পর্ষ করতে পারলেই গোল্লা থেকে জোড়া লাফ দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। এতে বিজয় আরো সহজ হয়ে যায়। এবং রাজা যদি সীমানা ছুতে পারে তবেই সেদল বিজয়ী হয় এবং আবার গোল্লা থাকে তাদের দখলে। এবং প্রতিপক্ষ থাকে মাঠে তাদের ছোঁয়ার জন্য। যাকে ছুতে পারবে সে বাদ পরবে খেলা থেকে। আর যদি রাজা সীমানা স্পর্ষ করতে না পারে তারা হেরে যাবে এবং তারা গোল্লা থেকে বাইরে চলে আসবে। আবার একই নিয়মে চলতে থাকবে খেলা।

 

কানামাছি :
কানামাছি খেলাটি এককালের শিশুদের খুবই জনপ্রিয় খেলা। এই খেলা বেশির ভাগই বাড়ির উঠোনে খেলে থাকে শিশু কিশোর/ কিশোরীরা। এই খেলাতেও খেলোয়াড় সংখ্যা নিয়ে নেই কোন সমস্যা। এতে একজন থাকে মাছি। তার চোখ বাঁধা থাকে কাপড় দিয়ে। এবং অন্যান্যরা তার চার পাশে ঘুরতে থাকে আর ছড়া কাটে “কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ” বলে। মাঝেমাঝে পেছন থেকে খোঁচা মেরে আনন্দ করে অনেকে। কানামাছি যদি সামনে থেকে কাউকে ধরে ফেলতে পারে তবে সেই হবে নতুন কানামাছি। 

 

বৌ-চি:
এই খেলায় পাশাপাশি দুটো সীমানা থাকে। সাধারণত পাশাপাশি দুটো গাছকে কেন্দ্র করে হয় এই খেলাটি। টস হয় প্রথমে। একটি পাতাকে ছিড়ে ছোট টুকরো করা হয়। পরে দু দলের যেকোন দলনায়ক একটি অংশ চিহ্নিত করেন।এবং ফু দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়। যে টসে জিতে সেদলই থকে ঘরে। বাকি দল বাইরে। যারা ঘরে তারা থাকবে গাছের (সীমানা) পাশে। আর যেদল বাইরে তারা গাছের চার পাশে থাকবে। দুটি গাছের (সীমানা) একটির নিচে থাকে শুধু মাত্র একজন। আর বাকিরা সব বউয়ের সাথে অন্য গাছটির (সীমানা) নিচে। বউয়ের সাথে থাকা একজন প্রথমেই বেরিয়ে বলবে “ প্রথম বোল দিয়ে যাই, সাবাইকে বলে যাই”। পরে আরেক জন বেরুবে এবং এক নিস্বাস বলে যাবে চি... কুত... কুত... কুত........(অনেক অঞ্চলে আবার বিভিন্ন ছড়া কাটা হয়) । এই বোলের মাঝে প্রতিপক্ষ লোকদের তাড়া করবে সে। যদি কাউকে স্পর্ষ করতে পারে তবে সে বাদ মানে অউট। নিস্বাস থাকতে থাকতেই ঘরে ফিরে আসতে হবে। না হয় প্রতিপক্ষের কেউ তাকে ছুঁয়ে দিলে সেই বাদ পরে খেলা থেকে। এভাবে সাতবার পর্যন্ত একজন একজন করে বেরুবে আর বোল দিবে। এর মধ্যে গাছের নিচে একা থাকা খেলোয়াড় বউয়ের কাছে চলে আসার চেষ্টা করবে। আর বউ চেষ্টা করবে অপর গাছটির (সীমানা) নিচে যাওয়ার জন্য। যদি এই যাওয়া আসার সময় প্রতি পক্ষের কেউ তাদের স্পর্ষ করে তবে তারা হেরে গেল। আর যদি কেউ স্পর্ষ না করতে পারে। সফল ভাবে দুজন দুই গাছের নিচে চলে যেতে পারে তবে তারা বিজয়ী। সর্বমোট সাত বার বোল দেওয়া যাবে। এর মাঝে বউ যদি সফল ভাবে গাছের (সীমানা) নিচে না যেেেত পারে তবে তারা হেরে গেল। এবং অপর পক্ষ ঘরে আসবে। এভাবেই পালাক্রমে চলতে থাকে বৌ-চি খেলা।

 

ডাংগুলি :
ডাংগুলি খেলাটা অনেকটাই বিপদজ্জনক। তাই অনেকের অভিবাবকরাই ছেলেদের এই খেলা খেলতে দিতনা। যেমনটি আমাকে খুব বকাঝকা করত আমার বাবা এই খেলার জন্য। তবুও সবাইকে ফাকি দিয়ে দুরে অন্য বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে খেলতাম। যাই হোক উপরের খেলা গুলোতে কোন সরঞ্জামের দরকার না হলেও এই খেলাতে দুটো সরঞ্জামের প্রয়োজন। একটি দেড় হাত বা এর কাছাকাছি একটি লাঠি বা ডান্ডা যাকে বলা হয় ডাং, এক বিঘে বা তার চেয়ে ছোট আরেকটি লাঠি এক বলা হয় গুলি। এগুলো গাছের ডাল দিয়ে বানানো হয়। আর মাটিতে খুঁড়তে হয় ছোট্ট একটি গর্ত। ব্যস হয়ে গেল। অপর খেলা গুলোর মতে এইখেলাতেও খেলোয়াড় সংখ্যা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। দুই জন হলেও খেলা যায়। তবে বেশি হলে মজা একটু বেশি হয়। টসের মাধ্যমে যারা দান পায় তাদের একজন গর্তের গুলি রেখে ডান্ডা দিয়ে সেটিকে একটি নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে হয়। তবে সীমানার বাইরে থাকা দ্বিতীয় দলের সদস্যরা এটিকে শূণ্যে থাকা অবস্থায় ধরার অপেক্ষায় থাকে। কেননা ধরতে পারলে প্রথম প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়কে বাদ পড়তে হয়। আর ধরতে না পারলে সেখান থেকে প্রথম দলের খেলোয়াড় ডান্ডা দিয়ে তুলে গুলিকে শুন্যে ভাসিয়ে আবার দূরে পাঠায়। তারপর গুলি থেকে গর্ত পর্যন্ত ডান্ডা দিয়ে মাপা হয়। সাত পর্যন্ত মাপের আঞ্চলিক নাম হলো: বাড়ি, দুড়ি, তেড়ি, চাগ, চম্পা, ঝেঁক, মেক। এরূপ সাত মাপে এক ফুল বা গুট এবং সাত ফুলে এক লাল হয়। ভাঙা ফুলের ক্ষেত্রে যেখানে শেষ হয়, পরের খেলা সেখান থেকে শুরু হয়। বাড়ি, দুড়ি, ইত্যাদি প্রতিটি মারের জন্য আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। বাড়ি/ বাম পায়ের পাতার উপর গুলি রেখে ডান হাতে থাকা ডান্ডা দিয়ে আঘাত করে দুরে পাঠাতে হয়। দুড়ি/ বাম হাতের শাহাদৎ এবং মধ্যমা আঙ্গুলের উপর গুলি রেখে ডান হাতে থাকা ডান্ডা দিয়ে জোরে আঘাত করে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে পাঠাতে হয়। তেড়ি/ তেড়িতে তেমন কোন বিশেষ কিছু করতে হয় না বা না মারলেও চলে।চাগ/ বাম হাতের পাতার উপর গুলিটিকে রেখে ডান হাতে থাকা ডান্ডা দিয়ে জোরে আঘাত করে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে পাঠাতে হয়। চম্পা/ বাম হাতে স্বাভাবিক ভাবে বা নিজের সুবিধামত গুলি ধরে ডান্ডা দিয়ে আঘাত করে নির্দিষ্ট দাগ আতিক্রম করতে হয়। মেক/ বাম হাতের মুঠোর উপর গুলি রেখে ডান হাতে থাকা ডান্ডা দিয়ে গুলিকে দুরে পাঠাতে হয়।এই ভাবে একজন খেলোয়াড়কে খেলতে হয়। প্রত্যক খেলোয়াড়ের সুযোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলে যেতে হয় খেলোয়াড়কে। এভাবে সকল খেলোয়াড়ের সুযোগ শেষ হয়ে গেলে অপর পক্ষের খেলা শুরু হয়। একই নিয়মে তারাও খেলতে থাকে।

 

কুতকুত:
এটি মেয়েদের খেলা। দুইজন বা তার অধিক খেলোয়াড় প্রয়োজন এখেলার জন্য। মাটির হাঁড়ির একটি ভাঙ্গা টুকরো যাকে বলা হয় চাড়া অথবা ঝিক। মাটিতে দাগটেনে দুইপাশে তিনটি করে ছয়টি ঘর (বর্গক্ষেত্র) তৈরী করা হয়। পরে নির্দিষ্ট একটা পাশ থেকে প্রথম ঘরে চাড়াটি ছুড়ে মারা হয়। এবং কুত...কুত...কুতততততত নিস্বাস এর মাঝে এক পয়ে চাড়াটি সব গুলো ঘর অতিক্রম করে অপর প্রান্তে নিয়ে আসতে হয়। চাড়াটি নেওয়ার সময় দাগে পড়লে আউট। আবার পরের জন। এভাবে সব কটি ঘর পার হলে চোখ উপরের দিকে উঠিয়ে না দেখে সব কটি ঘর হেটে যেতে হয়, তবে দাগে পা পড়লে আউট। এসময় যে হেঁটে যাবে সে বলবে আছেকি, মানে গাগে পা পড়েছে কিনা। যদি না পড়ে তবে অপরজন বলবে আছে। আর দাগে পা পড়লে বলবে নাই। এবং এর পরে যে স্থান থেকে চাড়াটি মারা হয় ঠিক তার বিপরিত পাশ থেকে না দেখে মুখ বন্ধকরে উল্টো ঘুরে মাথার উপর দিয়ে চাড়াটি ছুরে মারতে হয় ঘরের মধ্যে। এর পর পাশ দিয়ে এসে মুখ খুলে চাড়াটি নিয়ে সে ঘরে একটি ক্রস চিহ্ন দিয়ে দেবে। এতে করে ঘরটি তার দখলে চলে আসে। এবং সে তার ঘরটিতে খেলার মাঝে নিস্বাস ছেড়ে জিরিয়ে নিতে পারে। এবং অপর জন এই ঘওে পা রাখতে পারবে না। পা রাখলে আউট। এভাবে যার দখলে ঘর বেশি থাকবে সেই বিজয়ী।

 

মাছটোকা:
মাছটোকা খেলাতে দুইজন দল নায়কের মাঝে সমান সংখ্যক খেলোয়াড় থাকতে হয়। কোথায়ও এটি বউরানী এবং ফুলটোকা খেলা নামেও পরিচিত। মাঝখানে ফাকা রেখে কিছু দুরত্বে দুইটি দাগ দিতে হয় প্রথমে। দলনায়ক ব্যতিত বাকি দুই পক্ষের খেলোয়াড়রা দাগের মধ্যে আড়া আড়ি ভাবে বসে পরবে। এই খেলাতেও দলনায়ককে রাজা বলা হয়। খেলার শুরুতেই রাজা ফুল-ফল, অথবা মাছের নামে নিজের দলের সদস্যদের নাম রাখবেন।কোন পক্ষ ফুলের নাম রাখবে কোন পক্ষ মাছের নাম রাখবে সেটাও কোন কোন সময় ঠিক করে নেওয়া হয়। তারপর রাজা বিপক্ষ দলের যেকোন একজনের চোখ হাত দিয়ে বন্ধ করে, ‘আয়রে আমার শাপলা ফুল, বা আয়রে আমার পুঁটিমাছ” ইত্যাদি নামে ডাক দেয়। সে তখন চুপিসারে এসে যার চোখবন্ধ তার কপালে মৃদু টোকা দিয়ে খুব আস্তে আস্তে নিজ অবস্থানে ফিরে যায় এই সময় সবাই একসাথে জোরে “ক খ গ, মাথায় হেড”পড়তে থাকে। এরপর চোখ খুলে দিলে ওই খেলোয়াড় যে টোকা দিয়ে গেল তাকে সনাক্ত করার চেষ্টা করে। অনেক সময় হাসাহাসি এবং ভাবভঙ্গীমায় বলে দেওয়া যায় কে টোকা দিয়েছে। আাবার কোন কোন সময় অন্যান্যরাও এমন ভাব করে যেন সে টোকা দিয়েছে। যদি বলতে পারে তবে সে দাগথেকে লাফ দেবে। যতটুকু সানে আসেবে সেখানেই বসবে। এবার বিপক্ষের রাজা একই নিয়ম অনুসরণ করে। এভাবে লাফ দিয়ে মধ্যবর্তী সীমা অতিক্রম করে প্রতিপক্ষের সীমানা দখল না করা পর্যন্ত খেলা চলতে থাকে।

 

লুকোচুরি:
এই খেলাতেও একটি গাছকে কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয় এবং এই খেলাতেও খেলোয়াড় সংখ্যা কোন বিষয়না। টসে যে হেরে যাবে সে গাছের নিচে চোখ বুঝে থাকবে এবং ছড়া কাটবে “ লুকোচুরি টুকটাক, ঘরের পিছে লুকিয়ে থাক”। এর ফাকে বাকি সবাই গাছের কাছাকাছি লুকিয়ে পরবে। সবাই লুকিয়ে গেলে তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উটে টুউউউউক....। এবার চোখখুলে সে দেখে আসে পাসে সবাই কোথায় আছে। এবং সে তাদের দৌড়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করে। যাকে ধরতে পারবে সে আউট এবং তাকে আবার চোখ বুঁঝতে হয়। এবং একজনকে দৌড়ানোর সময় অপর খেলোয়াড়রা দৌড়ে এসে গাছ স্পর্ষ করে ফাক্কা বলে। তাদের আর ধরলেও সমস্যা নেই।

 

মার্বেল :
মার্বেল একটি জনপ্রিয় খেলা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই খেলার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এই খেলাতে দুই জন বা এর চেয়ে বেশি খেলোয়াড় লাগে। হয়তো এখনো রয়েছে কোথায়ও কোথায়ও তবে আগের মতো কোথায়ও নেই। প্রথমে মাটিতে দেড় দুই গজ দুরত্বে দুটি দাগ দিতে হয়। পরে সামনের দাগ থেকে একবিঘা বা একহাত দুরত্ত্বে একটা মার্বেল বসিয়ে ছোট একটা গর্ত করা হয়। এরপর সবাই একে একে অপর প্রান্তের দাগে বসে সে গর্তের দিকে মার্বেল ছুড়ে। যার মার্বেলটি গর্তের একবোরে কাছে থাকবে সে ফাষ্ট এভাবে সেকেন্ড থার্ড নির্ধারণ হয়। এবার শুরু মূল খেলা। সবাই দুটো, তিনটে বা চারটি করে মার্বেল দেবে ফাষ্টের হাতে। এবং সেও দেবে। এবার সব গুলো একসাথে গর্তের দিকে ছুড়বে। তারপর যেকোন একজন মার্বেল গুলোর মধ্য থেকে যেকোন একটি মার্বেল চিহ্নিত করে দেবে। তো ফাষ্ট এবার দাগে পা রেখে তার হাত থেকে একটি মার্বেল আগের ছুড়ে মারা মার্বেল গুলোর দিকে। যদি দেখানো মার্বেলটি ছাড়া অন্য কোন মার্বেলের গায়ে লাগে তো মার্বেল গুলো তার। দেখানো মার্বেলটি অথবা দুইটি মার্বেলের সাথে লাগে তবে সে পাবেনা। আর যদি সে না পায় তো সেকেন্ড মারবে সেকেন্ড নাপেলে থার্ড মারবে। না পাওয়া পর্যন্ত চলবে। এক জন পাওয়ার পর আবার নতুন করে শুরু হবে। এভাবেই চলতে থাকবে। 

 

ওপেন টু বায়োস্কোপ :
এ খেলাতেও নেই খেলোয়াড় সংখ্যা নিয়ে কোন ঝামেলা। এই খেলায় থাকে দুইজন রাজা। তারা অবস্যই অনেক অভিজ্ঞ। দুই রাজা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে গেট তৈরি করে। বাকি খেলোয়াড়রা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে রেলগাড়ির মতো লাইন করে সেই সেই গেটের ভেতর দিয়ে পার হয়। গেটের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সবাই এক যোগে ছড়া কাটে।
“ওপেন টু বায়োস্কোপ
নাইন টেন তেইশ কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব-বাবুর বৈঠকখানা
সাহেব বলেছে যেতে
পানের খিলি খেতে
পানেতে মৌরি বাটা
স্প্রিংয়ের চাবি আঁটা
যার নাম মণিমালা
তারে দেবো মুক্তার মালা”
মুক্তার মালা বলার সাথে সাথে দুই রাজা হাত নামিয়ে নেয়। এবং এই সময় তাদের হাতের মধ্যে অটক করে। আগেই ঠিক করা থাকে যে খেলোয়াড় পড়বে সে কোন রাজার দলে খেলবে। এভাবে প্রথম খেলোয়াড়ের দল নির্বাচন হয়ে গেলে তাকে বাদ দিয়ে আবার শুরু হয় রেলগাড়ি চলা। সাথে ছড়াতো আছেই। দ্বিতীয়বারে যে ধরা পড়ে সে দ্বিতীয় রাজার দলে খেলে। এভাবে একজন করে ধরে দলে ভেড়ায় রাজারা।
এছাড়াও চোর-পুলিশ, ধাপ্পা, লাটিম ঘুরানো, এক্কাদোক্কা, পুতুল বিয়ে দেওয়া, মাটি দিয়ে মিছে মিছে ভাত রান্না করা, মিছে মিছে এ বাড়ি সে বাড়ি দাওয়াতের অভিনয়, কাঁঠাল পাতাকে টাকা হিসেবে ব্যাবহার করে ঘাস লতাপাতা কেনা সহ নাম জানা অজানা অনেক খেলা রয়েছে যেগুলো অনেক জনপ্রিয় ছিল একসময়। গ্রামের আঁকা বাঁকা রাস্তায় রিং বা চাক্কা চালানো আর ঘুড়ি উড়ানোতো ছিলই। কিন্তু বর্তমানে এইসব খেলা গুলো বিলুপ্ত প্রায়। আধুনিক সভ্যতা আর প্রযুক্তির করাল গ্রাসে বিলিন হয়ে গেছে এইসব গ্রামীন খেলাগুলো।


লেখক- তরুন লেখক, কবি, সাংবাদিক, সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী।