বিশেষ সংবাদ:

সন্ত্রাস প্রতিরোধে নৃত্যকলার অবস্থান

Logoআপডেট: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৫

মিনা মোঃ নজরুল ইসলাম

সন্ত্রাস আজ একবিংশ শতাব্দীর বিরাট চ্যালেঞ্জ। মানবসভ্যতা বোধকরি মানবসৃষ্ট এত বড় মহাসংকট ইতিপূর্বে লিখিত ইতিহাসের কালে হয়েছে বলে জানা যায় না।

 

স্মরণকালের পারপর দুইটি বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, হিরোশিমা, নাগাসাকির এট্যমবোমার হৃদয়বিদীর্ন স্মৃতি কালের সাক্ষী হয় আছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী শাসন শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রীক সংগঠন বা গেরিলা সংগঠনের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়।

 

ততদিনে ক্যাপিট্যালইজম ও স্যোশিয়ালিজমের তথা কমুনিষ্ট সমাজ গঠনের জন্য বিশ্ব দুই শিবিরে ভিক্ত হয়ে গেছে। তৈরী হয়েছে রণসজ্জায় ন্যাটো ও ওয়ারর্স জোটভূক্ত দেশের তীব্র সংঘাতময় পরিস্থিতি। বলিভিয়ায় চে-গুয়ভারা কিউবাতে ফিদেল কাস্ত্রো সমাজতান্ত্রিক সমাজগঠনে গেরিলা যুদ্ধে কিউবায় কাস্ত্রো ক্ষমতা দখল করলেন ও দিকে কোরিয়ার যুদ্ধে দুই শিবির ভাগাভাগি করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মেনে নিলেও ভিয়েতনামে ভিয়েত কং গেরিলারা ২০/২৫ বৎসর গেরিলা যুদ্ধ করে শাসন ক্ষমতা দখল করে। যদিও তারা পরবর্তীতে মতাদর্শ পরিবর্তন করে।


দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় সেভিয়েটদের আফগানিস্তান দখলের সূত্র ধরে। চীন সোভিয়েটের আদর্শিক দ্বন্দের ঘোলাপানিতে ক্যাপিটালইজম ও কমুউনিজুমের সংঘাতে গড়ে উঠতে থাকে কঠোর ধর্মীয় ভাবধারায় পুষ্ঠ তৃতীয় ধারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইটলারের নৎসীবাহিনীর বর্বরতার ফলশ্রুতিতে মধ্যেপ্রাচ্যে গড়ে উঠা ইসরায়েল রাষ্ট্র ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। আল-ফাত্তাহ্, আলকায়দা, তালেবান, আইএস আজকের বিশ্বে অতিপরিচিত নাম। প্রায় সব রাজধানীর শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের প্রতিনিয়ত এদের কার্যকলাপ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

 

সবকিছু মিলে ইসলামিক ট্রেররিষ্ট নামে নতুন শব্দ সমধিক পরিচিতি লাভ করে। আমাদের প্রসঙ্গ সন্তাসবাদ তাই সন্ত্রাসের উৎস, বিস্তার, লালন ও প্রয়োগের মূল উৎসের পটভূমির দিকে আলোকপাত না করলে সমস্যার সমাধান বা আমাদের করণীয় কর্তব্য ব্যাহত হতে পারে। 
পাতা নং- ০১
উপরে উল্লেখিত ভূমিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখন গোষ্ঠী প্রধান্য, সম্প্রদায় কেন্দ্রিক ধর্মীয় প্রধান্য, মতাদর্শ কেন্দ্রিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায়, ক্ষমতা কেন্দ্রিক, ক্ষমতা রক্ষায়, সন্ত্রাসকে লালন পালন করা হয়। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক এটাই বাস্তব সত্য। সত্যকে অস্বীকার করে কোন সমস্যার সমাধান আশা করা অর্বাচীনের স্বপ্ন মাত্র। রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ার শ্বেত সন্ত্রাস, ধর্মীয় উন্মাদনায় জঙ্গী কর্মকান্ড, মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় গণযুদ্ধ, আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে মাফিয়াচক্র, রাষ্ট্রীয় সংবদ্ধ জোটের আক্রমণ যে নামেই আসুক বিনা বিচারে মানুষ হত্যা আজকের সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন প্রজন্ম তা কখনই বরদাস্ত করবে না।

 

সমাজবদ্ধ মানুষের সমাজকেন্দ্রিক জীবন আজকের যে সভ্যতা উৎকর্ষ সাধনে ব্যাপৃত। তার মূলমন্ত্রই প্রশান্তি, বিজ্ঞান- প্রকৌশলের যে স্বর্ণদ্বার আজ উন্মোচিত তা মানব কল্যানে উৎসর্গীকৃত না হলে এ বিশ্বের মানবসভ্যতা অবশ্যম্ভাবী রূপে দারুন সংকটের মুখোমুখী হতে বাধ্য। অন্য কথায় বলা যায় আমরা ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দন্ডায়মান।

যেহেতু নৃত্যশিল্পবৃন্দ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই এই সন্ত্রাসবাদের কালো থাবায় তারাও উদ্বেগ, উৎকন্ঠায় সহযাত্রী। সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি তাদেরও বিরাট দায়বদ্ধতা আছে। শিল্পীসমাজের দূরর্দশীতা সমাজ গঠনের দৃঢ় প্রত্যয়ে সামাজিক কূপমন্ডিতা পরিহার করে শিল্পীসত্ত্বায় নিজে উদ্ভাসিত হয়ে সমাজকে যেমন পথ দেখাবে তেমনি বিশ্ব- সাংস্কৃতিতে অবদান রেখে মানবতার জয়গান তুলে ধরবে এটাই প্রত্যাশা। সত্য, সুন্দর, মঙ্গলের সাধনায় ব্যপৃত শিল্পী সমাজ, নতুন পথের চির অনুসন্ধানী নির্ভিক অগ্রদূত। বিশ্বসমাজ তাদের কাছে বিরাট কিছু আশা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বলেন-
চারদিকে নাগিনীরা ফেলিছে
বিষাক্ত নিঃশ্বাস
শান্তির ললিত বাণী
শুনবে ব্যর্থ পরিহাস।

আবার তিনিই যখন প্রশ্ন রাখেনঃ

যারা তোমার বিষাইছে বায়ু
নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের করিয়াছ ক্ষমা
তবুকি বেসেছ ভাল?
আমরা এটুকুই জানি আমাদের ব্যর্থ হবার কোন অবকাশ নাই, ভালবাসারও কোন বিকল্প নাই। তা চলছে চলবে। আজ সংঘাতময় বিশ্বে পারিবারিক দ্বন্দে, সমাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে, ব্যক্তি স্বাধীনার উগ্র আস্ফলনে আজ আমার কোথায় চলেছি? তা কি কখন আমরা নিজেদের কাছে গভীর ভাবে প্রশ্ন রেখেছি। ব্যক্তিকে নিয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব জগৎ। নিজেদের দায়-দায়িত্ব, কর্তব্য আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। আমাদেরকে শুধু সতর্ক নয় সচেতন হতে হবে। নিজ দায়িত্বে নিজকেই গড়ে নিতে হবে। এটাই আশার কথা।

যখন জাতীয় কবি কাজী নজর”ল ইসলাম বলেন-

খোদার হাবিব (সাঃ) কহিয়া গিয়াছেন
ঈসা (আঃ) আসিবেন ফের
চাহিনা তাহারে তুমি এস বীর
হাতে নিয়ে শমসের।

আমাদের আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস-২০১৫ এর শ্লোগান “সন্ত্রাস রুখে দাও নৃত্যের ছন্দে”। সন্ত্রাস রুখার তীব্র বাসনা থেকেই এই উচ্চারণ। কবির অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কামনায় শমশের তথা তলোয়ার তথা শক্তির উন্মোচনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আমাদের শ্লোগানের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পর্ক যুক্ত।

 

এ প্রসঙ্গে তথা “সন্ত্রাস প্রতিরোধে নৃত্যকলার অবস্থান” সম্পর্কে আমাদের অবস্থান একেবারে স্বচ্ছ ও দৃঢ়। নাগিনীর বিষাক্ত নিঃশ্বাসকে ব্যার্থ করতে হবে, মানুষকে ভালবাসতে হবে। বিশ্ব-বিবেক কে অতন্ত্র¿ প্রহরীর মত নির্ভিক চিত্তে সমুন্নত রাখতে হবে। সেটাই হবে মানবাতার মুক্তি, প্রশান্তির স্বর্নদ্বার, মানবসভ্যতার স্বপ্নসৌধ। মানব প্রগতির এই শর্পিল পথ- পরিক্রমায় সন্ত্রাস প্রতিরোধে নৃত্যশিল্পীবৃন্দও সহযাত্রীই শুধুনা সহযোদ্ধা।