বিশেষ সংবাদ:

মঞ্চাঙ্গনে নেই ঈদায়োজন, থাকেনা দ্রুত নাটকসংশ্লিষ্টদের ফেরানোর উদ্যোগ

Logoআপডেট: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫

ফারুক হোসেন শিহাব
ঈদকে ঘিরে দেশের সকল মাধ্যমেই আনন্দের অন্ত থাকেনা। সবাই মাতে বর্ণীল ঈদামেজের আনন্দযজ্ঞে। বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের সাথে সবার মতো বিনোদন মিডিয়ায়ও থাকে ব্যতিক্রমতা।

 

বিনোদন অঙ্গনের সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বস্তরের মানুষকে বিনোদিত করতে চেষ্টার আর কমতি রাখেনা।

 

তাইতো ঈদকে ঘিরে জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, বোটানিকাল গার্ডেন, বিভিন্ন পার্ক এবং পর্যটনস্পট যেমনি থাকে সরব তেমনি বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সপ্তাহব্যাপী জমকালো ঈদায়োজনে মাতিয়ে রাখে সংস্কৃতিপ্রেমীদের। ঈদকে ঘিরে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনেও ব্যস্ততার কমতি নেই। এ অর্থে ঈদকেন্দ্রিক সময়টায় একেবারেই নিরসতায় কাটে দেশের মঞ্চাঙ্গন। সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে রয়েছে নানা রকম মতভাব।

 

মূলত, প্রতি বছর শুধু রমজান মাসেই আমাদের মঞ্চাঙ্গনে চলে চরম খরা। ইবাদতের তাৎপর্যবহ এ মাসে নানা কারণে মঞ্চে দর্শক উপস্থিতি একেবারেই কমে যায়। ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে রমজান মাসে এমনটাই স্বাভাবিক। ফলে দলগুলোও নাটক মঞ্চায়নে অনাগ্রহী হয়ে ওঠে।

 

বিশেষ করে এ সময়টায় কোন দলই নাট্যপ্রদর্শনী কিংবা বিশেষ কোন আয়োজন করতে অপারগতা দেখায়। মঞ্চ নাটকের কেন্দ্রস্থল নাটকপাড়ার জাতীয় নাট্যশালার মূল হল, পরীক্ষণ হল এবং স্টুডিও থিয়েটার হলের বরাদ্দ পাওয়ার জন্য যেখানে বছরজুড়ে নাট্যদলগুলোর মধ্যে থাকে তুমুল প্রতিযোগিতা। কার আগে কে বরাদ্দ পাবে রীতিমত তেমনি চলে দৌড়-ঝাঁপ। ফলে নাটকের দলগুলো সারাবছর নিয়মিত নাট্যচর্চায় ব্যাস্ত সময় পার করলেও রমজানে এসে সেই ক্লান্তি ঝেড়ে যেন স্বস্থিও শ্বাঃস নেয়। শুধু শিল্পকলা একাডেমীর হলগুলোই নয় নগরীর জহির রায়হান মিলনায়তন, ঢাবি’র নাটমন্ডল কিংবা ছায়ানট মিলনায়তনেও আনুষ্ঠানিকতায় একই চিত্র।

 

কেবল রমজান ও ঈদুল ফিতরেই নয় ঈদুল আযহাকে ঘিরেও আগে-পরে ১৫-২০দিন মঞ্চাযজ্ঞে ভাটা পড়ে। কেননা, সার্বিক অর্থে রাজধানীকেন্দ্রিক থিয়েটারচর্চা হওয়া এবং এরসঙ্গে বেশিরভাগই মফস্বলের মানুষ সম্পৃক্ত থাকার কারণে এ সময়টাতে থিয়েটারকার্যক্রমে ছেদ পড়ে। কারণ রমজান জুড়ে রোজা রাখা, ইফতার ও তারাবি নামাজের পাশাপাশি দুই ঈদেই কেনা-কাটা ব্যস্ততা এবং ঈদের ছুটিতে নাড়িরটানে গ্রামে ছুটে যাওয়ায় বলাচলে ঢাকা- ফাঁকা হয়ে পড়ে।

 

নাট্যমঞ্চগুলোর সাথে সংশ্লিষ্টদেরকেও সেই গতিতেই চলতে হয়। আবার ঈদের ছুটি কাটিয়ে রাজধানীর কর্মস্থলে ফিরে নাটকে মনোনিবেশ করতে আরও ১০/১৫ দিন সময় লেগে যায়। কিন্তু ঈদের পরপরই নাট্যাঙ্গনে দ্রুত দর্শক ও সংশ্লিষ্টদের ফেরাতে বিশেষ কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনা। দু-চারটি নাট্যদলের ঘরোয়া ঈদপূণর্মিলনী ছাড়া ঈদামেজে নাট্যঙ্গনকে সরব করতে কোন নাট্যদল কিংবা নাটকের সহায়ক সংগঠনগুলোর কোনপ্রকার উদ্যোগ নেই।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী বলেন, রমজান মাসে তুলনামূলকভাবে দর্শক সংখ্যা কমে যায়। একটি মুসলিম প্রধান দেশে এটি স্বভাবসূলভ ব্যাপার। কারণ আমাদের ধর্মীয় কৃষ্টি-আচার-অনুভূতি খুবই গুরুত্বের জায়গা। রমজানে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান সারাদিন রোজা রাখার পর শারীরীক দূর্বলতার পাশাপাশি তারাবি নামাজের বিষয় থাকে। ফলে এ সময়টায় নাট্যাঙ্গনে নিয়মিত হওয়াটা দুঃস্বাধ্য। ঈদের সময় অন্যদের ন্যায় এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও ছুটিতে থাকে। তাই এসময়টাতে এধরণের আয়োজন হয়ে ওঠেনা। এমনকি আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি। তবে ঈদের পর পরই ঈদকেন্দ্রিক নাটক বা সাংস্কৃতিক উৎসবের কোন উদ্যোগ নিলে দলগুলো নিতে পারে।

 

এ প্রসঙ্গে সম্মিলীত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রাঙ্গন হলো বানিজ্যিক জায়গা তাই ঈদকেন্দ্রিক এসব মাধ্যমে নানা আনুষ্ঠানিকতায় জমজমাট থাকে। একজন সাংস্কৃতিককর্মীর জন্য সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার সাথে সাথে ধর্মীয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাও গুরুত্বের। সে অর্থে রমজান ও ঈদ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। এজন্যই এর সঙ্গে জড়িয়ে সে ধরণের কোন আয়োজন নিয়ে আমরা ভাবছিনা।

 

এ বিষয়ে ফেডারেশনের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী বলেন, প্রকৃতপক্ষে রাজধানীর প্রধান সমস্যা জ্যামের ভয়ে অনেকেই রমজান মাসে সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সাহসই পায় না। কারণ, একজন মানুষ সন্ধ্যায় বের হয়ে জ্যাম ডিঙ্গিয়ে কখন বাসায় ফিরবে তার নিশ্চয়তাইবা কতটুকু।

 

বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা বলেন, ১৫ রমজানের পর কেনাকাটা এবং গ্রামের বাড়ি যাওয়ার তাগিদসহ বিভিন্ন কারণে নাটকপাড়ায় দর্শক সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। এই সময়টাতে দেখা যায় মিলনায়তনগুলোর কারিগরি কোন সমস্যা থাকলে মেরামত কাজে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

 

ফেডারেশন সেক্রেটারী আকতারুজ্জামানও একই মত পোষন করে বলেন, ধর্মীয় কারণেই রমজানে নিরসতা। তবে আমাদের সিনেমা অঙ্গন ও টিভি চ্যানেলে যেমনি করে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা থাকে, মঞ্চাঙ্গনে তেমনি বিশেষ আয়োজন থাকলে চমৎকার হতো। বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আমাদের পরিকল্পনা আছে।