বিশেষ সংবাদ:

চ্যাপলিন-মার্সো উৎসবে প্রাণে-প্রাণে একাকার

Logoআপডেট: মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৬

এবি প্রতিবেদক
সংলাপহীন নির্বাক শিল্পমায়ায় ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নাটকপাড়ার দর্শকদের রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেয় চট্টগ্রামের প্রতিশ্রুতিশীল মাইমদল প্যান্টোমাইম মূভমেন্ট ও ঢাকার দল জেন্টলম্যান প্যান্টোমাইমের তারুণ্যদীপ্ত মূকশিল্পীরা।

 

কিংবদন্তি অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে দুই নাট্যসংগঠনের যৌথ আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালাস্থ স্টুডিও থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘চ্যাপলিন-মার্সো মুকাভিনয় উৎসব-২০১৬’।


আনুষ্ঠানিকতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলীত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশনের সভাপতি জাহিদ রিপন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান সুদীপ চক্রবর্তী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হালিম প্রামানিক সম্্রাট এবং বিনোদন ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ‘আমার বিনোদন’ এর সম্পাদক ফারুক হোসেন শিহাব।

 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, 'মূকাভিনয় এমন একটি শিল্প, যার সৃষ্টি খুবই প্রাচীন। মানুুষ যখন কথা বলতে পারতোনা অর্থাৎ যখন উচ্চারিত কোন ভাষারই আবিষ্কার হয়নি তখন মনের ভাব প্রকাশের প্রয়োজনে দুটি মাধ্যমের প্রচলন হয়। একটি হচ্ছে ইশারা বা মাইম করে একে অপরকে মনের ভাব বা বার্তা পৌঁছাতো। অপর মাধ্যম হলো চিত্রকলা। প্রাচীন বিভিন্ন নিদর্শন থেকে আমরা সেই তথ্যই পাই। বিশ্ব জুড়ে বর্তমানে মাইমশিল্প খুবই জনপ্রিয় একটি বিনোদন মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্পের অগ্রগতি আশানরুপ হয়নি।

 

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু দল এই শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যপক কর্মতৎপরতা করছে। যার মধ্যে চট্টগ্রামের মাইমদল প্যান্টোমাইম মূভমেন্ট ও ঢাকার দল জেন্টলম্যান প্যান্টোমাইম অন্যতম। বলা চলে- নির্বাক অভিনেতারা এখন বেশ সরব।'


আয়োজনকে ঘিরে বিশ্বখ্যাত দুই পথিকৎ চ্যাপলিন-মার্সো’র স্থিরচিত্র ও নানা মূকচিত্রের বর্ণীল সমাহারে জাতীয় নাট্যশালার চিলেকোঠা চত্বর সাজে নব আবহে। চ্যাপলিন শুধু মূকাভিনেতাদের কাছে নয় সমগ্র বিশ্বে সকল অভিনেতা-পরিচালক, নাটক-সিনেমা প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাচিত্ত্বে উচ্চারিত নাম। অপরদিকে মার্সেল মার্সো বিশ্ব মূকাভিনয়ের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। মার্সোর মূকাভিনয়ের অনুপ্রেরনা চ্যাপলিন আর চ্যাপলিন এর স্বপ্ন ছিল মঞ্চে মার্সোর মত দূরন্তপনা আর মোহমায়ার জাল বুনন।

 

গত ২২ মার্চ মার্সেল মার্সোর জন্মদিনে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় দিবস। কাছাকাছি সময়ে গুরুশিষ্যের জয়ন্তিকে ঘিরে তাৎপর্যবহ এই আয়োজনও গুরুশিষ্য পরম্পরা। নাট্যাঙ্গনের উৎসাহমূখর এই উৎসবে বর্ণাঢ্য আলোচনাপর্ব শেষে প্রতিভাধর মূকনাট্যজন রিজোয়ান রাজনের নির্দেশনায় প্যান্টোমাইম মূভমেন্ট পরিবেশন করে হারজিৎ, টিট ফর টেট এবং টু ফার টু ক্লোজ। যেখানে প্রাণবন্ত আঙ্গিক ও দৃষ্টিমূখর অভিভ্যক্তির শিল্পীতমোহে উপভোগকারীদের ঋদ্ধ করেন মূকশিল্পী শহিদুল বশর মুরাদ, জোবায়েদ রানা ও রিজোয়ান রাজন। তাদের অনবদ্য পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শক অপলক শুধু চেয়েই ছিল। কেননা, তাদের চোখের সামনেই একের পর এক ঘটতে থাকে অদৃশ্যকে দৃশ্যে রূপায়নের প্রাণবন্ত প্রয়াস। নির্বাকতায় শূণ্য হাতের এতো মসৃণ কারুকাজ, মূহুর্তের মধ্যেই ভিন্ন-ভিন্ন আবহ চোখের সামনে ধরা দেয় ম্যাজিকের মতো। অসততা, নবীণ-প্রবীণেন দ্বন্ধ এবং সর্বনাশা মাদকের ছোবলকাব্যে দোল খেতে-খেতে অবলীলায় বিবেকের মুখোমুখি হয় দর্শক। ফলে বিনোদন আর মানসিক ও মানবিক আবেদনে তারা নিশ্চিত তৃপ্ততা আস্বাদন করে।

 

এর পরই রাজ ঘোষের নির্দেশনায় জেন্টলম্যান প্যান্টোমাইম পরিবেশন করে দি কন্ট্রোলার, লাইট অব ডার্কনেস এবং ডেমোক্রেজি। এখানেও মুগ্ধতায় মন ভরে দর্শকদের। যেখানে শিল্পের আলিঙ্গনে নবত্বের মাখামাখি। মূল্যবোধের অবারিত শিল্পাকাঙ্খায় অতঃপর দর্শকের ভেতরাত্মা জাগিয়ে তোলে জেন্টলম্যানের মূকশিল্পীরা। যেখানে দুর্দান্ত অভিনয়কারুতে দর্শকদের ঋদ্ধ করেন আদনান মাহমুদ, মাহবুবুর রহমান, জয়নাল আবেদিন জয়, নুয়েরী সারা এবং রাজ ঘোষ। রাষ্ট্রিয় কিছু অসঙ্গতিকে নির্বাকতার নান্দনিকতায় তুলে ধরা হয়েছে এ পরিবেশনে। মূকাভিনয় শিল্পাঙ্গনের সনামধন্য দল দু’টির প্রাণবন্ত পরিবেশনায় ‘চ্যাপলিন-মার্সো মুকাভিনয় উৎসব’ হয়ে ওঠে প্রাণে-প্রাণে একাকার।

আয়োজন প্রসঙ্গে প্যান্টোমাইম মূভমেন্টের কর্ণধার রিজোয়ান রাজন বলেন, সময়ের কাছে শিল্পের একান্ত দায় থেকে নতুন কিছু সৃষ্টির এই প্রয়াস। ধারাবাহিক চর্চাই একটি শিল্পের প্রকৃত রূপ উন্মেচনের প্রধান ক্ষেত্র। তাই, শিল্পের প্রতি অফুরন্ত দায় থেকে আমাদের পথচলা অব্যহত থাকবে বলে প্রত্যাশা রাখছি।